ইরানে মুদ্রার মূল্যপতনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তীব্র বিক্ষোভ চললেও ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ক্ষমতাকাঠামোয় এখনো বড় ধরনের ভাঙনের কোনো সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে না। কঠোর দমননীতি, দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক চাপ সত্ত্বেও শাসনব্যবস্থা আপাতত স্থিতিশীল রয়েছে বলে মনে করছেন মধ্যপ্রাচ্যের সরকারি সূত্র ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
সরকারি সূত্র ও বিশ্লেষকদের মতে, রাজপথের বিক্ষোভ কিংবা বিদেশি চাপ যদি রাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্রে বিভক্তি তৈরি করতে না পারে, তাহলে দুর্বল অবস্থায় থাকলেও ইরানের শাসনব্যবস্থা টিকে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে ভাঙন না ধরলে ক্ষমতার ভিত্তি অক্ষুণ্ন থাকে।
ইরান–আমেরিকান গবেষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ভালি নাসরের মতে, ইরানের বহুতল নিরাপত্তা কাঠামো এই শাসনব্যবস্থাকে অত্যন্ত স্থিতিস্থাপক করে তুলেছে। বিপ্লবী গার্ড ও বাসিজ আধাসামরিক বাহিনী এই কাঠামোর মূল ভিত্তি, যাদের সম্মিলিত সদস্য সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। তার ভাষায়, এই ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হলে দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাপক জনসমাগমের পাশাপাশি রাষ্ট্রের ভেতরে, বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীতে দলত্যাগ ও বিভক্তি তৈরি হতে হবে।
সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ও ইরান বিশেষজ্ঞ অ্যালান আইয়ার মনে করেন, পরিস্থিতি বদলাতে হলে বিক্ষোভকারীদের এমন গতি তৈরি করতে হবে, যা রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি, ধর্মীয় শাসনের প্রতি অনুগত গোষ্ঠী এবং ইরানের বিশাল ভূগোল ও বৈচিত্র্যকে অতিক্রম করতে সক্ষম হবে। নয় কোটির বেশি জনসংখ্যার এই দেশে কেবল রাস্তায় নামলেই ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে পড়বে—এমনটা সহজ নয়।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের পল সালেমের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি অতীতেও একাধিক বড় অস্থিরতার ঢেউ সামাল দিয়েছেন। ২০০৯ সালের পর এটিকে পঞ্চম বড় অভ্যুত্থান হিসেবে দেখা হলেও, গভীর ও অমীমাংসিত অভ্যন্তরীণ সংকটের মধ্যেও শাসনব্যবস্থা এখনো সংহতি ও স্থিতিস্থাপকতার পরিচয় দিচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, টিকে থাকা মানেই স্থিতিশীলতা নয়। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে ইরান এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় অর্থনীতি প্রায় স্থবির, পুনরুদ্ধারের স্পষ্ট কোনো পথ নেই। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপ, ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক কর্মসূচি এবং লেবানন, সিরিয়া ও গাজায় মিত্র গোষ্ঠীগুলোর ক্ষতির কারণে ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া অবস্থান। বিক্ষোভ দমনে কঠোর অভিযানের প্রেক্ষাপটে একাধিকবার সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন তিনি। গত বছর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর উত্তেজনা নতুন মাত্রা পায়। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের হাতে সব ধরনের বিকল্প খোলা রয়েছে।
এরই মধ্যে চলমান বিক্ষোভে প্রাণহানির সংখ্যাও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এক ইরানি কর্মকর্তার দাবি, প্রায় দুই হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা সদস্য উভয়ই রয়েছে। অন্যদিকে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী এই সংখ্যা প্রায় ৬০০, যা প্রকৃত চিত্র নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলছে।

আপনার মতামত লিখুন :