ক্ষমতার পরিবর্তন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কিংবা প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস—কোনো কিছুই দেশে ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের প্রবণতা কমাতে পারেনি। বরং পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও হত্যাকাণ্ড উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালে গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি নিয়ে প্রত্যাশা তৈরি হলেও বাস্তবতা ভিন্ন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সাধারণ নাগরিকদের ভাষ্য, সরকার যেই থাকুক না কেন, নিরাপত্তা সবারই মৌলিক অধিকার। কিন্তু প্রতিদিন ঘরে-বাইরে হত্যাকাণ্ডের খবর মানুষকে আতঙ্কিত করে তুলছে।
পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে সারা দেশে ৩ হাজার ২১৪টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়। ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ১২৬টি, ২০২৩ সালে কমে দাঁড়ায় ৩ হাজার ২৩টিতে। তবে ২০২৪ সালে আবার বাড়ে হত্যাকাণ্ড, সে বছর মামলা নথিভুক্ত হয় ৩ হাজার ৪৩২টি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আগস্ট মাসের প্রথম পাঁচ দিনসহ ওই বছরের শেষ পর্যন্ত পাঁচ মাসে থানাগুলোতে হত্যা মামলা হয়েছে ১ হাজার ৫৭৩টি। শুধু আগস্ট মাসেই নথিভুক্ত হয় ৬২৬টি মামলা। তবে এর মধ্যে ১৫৮টি মামলা ছিল ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগের সময়ে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়, যা পরে দায়ের করা হয়েছে।
২০২৫ সালেও একই চিত্র দেখা গেছে। ফেব্রুয়ারি মাসে নথিভুক্ত ৩০০টি হত্যা মামলার মধ্যে ২৪টি ছিল আগের সরকারের সময়কার ঘটনার। মার্চে যুক্ত হয়েছে ২৯টি এবং এপ্রিলে ১৯টি পুরোনো ঘটনার মামলা। সব মিলিয়ে ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন সময়ে আগের শাসনামলের হত্যাকাণ্ড নিয়ে মোট ২৩০টি মামলা দায়ের হয়েছে বলে পুলিশ সূত্র জানিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সে সময় অনেক ভুক্তভোগী মামলা করার সুযোগ পাননি বা সাহস করেননি।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির আশ্বাস দেওয়া হলেও গত দেড় বছরে শহর ও গ্রাম—উভয় এলাকাতেই প্রকাশ্যে গুলি, কুপিয়ে হত্যা ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। কিছু ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অনেক মামলায় তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় ধীরগতি নিয়ে অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ৫ আগস্টের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে তৈরি হওয়া মানসিক চাপ ও কাঠামোগত দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধী চক্র। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার কার্যক্রম কার্যকর না হওয়ায় এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগে পুরোনো ও নতুন সন্ত্রাসী গ্রুপ আবার সক্রিয় হয়ে উঠছে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি নিরাপত্তাহীনতায় পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
গুম সংক্রান্ত কমিশনের সদস্য ও মানবাধিকার কর্মী নূর খান বলেন, বর্তমানে যে মাত্রায় হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতা ঘটছে, তা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর ভূমিকার ঘাটতি স্পষ্ট। দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপ ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তার মতে, সামনে জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. মো. তৌহিদুল হক বলেন, হত্যাকাণ্ডসহ গুরুতর অপরাধে কার্যকর আইনি পদক্ষেপের অভাবে অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির মানসিকতা তৈরি হয়েছে। নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির কারণেও হত্যাকাণ্ড বাড়ছে বলে তিনি মনে করেন। অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনতে পারলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগের অনেক হত্যাকাণ্ড পরবর্তী সময়ে মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে, যা সংখ্যাকে বাড়িয়ে দেখাচ্ছে। তবে সামগ্রিকভাবে হত্যাকাণ্ড কমার কোনো স্পষ্ট প্রবণতা এখনও দেখা যাচ্ছে না বলেও তিনি স্বীকার করেন।
নির্বাচনের আগে সহিংসতা বাড়ার আশঙ্কা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় পুলিশ আগেই সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতা কমাতে সব ইউনিটকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে এবং নিয়মিত অভিযান আরও জোরদার করা হচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন :