নির্বাচন এলেই রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বেশি আলোচিত শব্দগুলোর একটি হয়ে ওঠে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’। কোনো দল বা জোট যখন মনে করে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে তারা সমান সুযোগ পাচ্ছে না, কিংবা কারও প্রতি রাষ্ট্রীয় বা প্রশাসনিক পক্ষপাত রয়েছে, তখনই এই শব্দবন্ধ সামনে আসে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে আবারও এই প্রশ্ন জোরালোভাবে উঠেছে—আসলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের মানদণ্ড কী, আর সেটি নির্ধারণই বা করে কে।
নির্বাচনি প্রেক্ষাপটে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলতে এমন একটি পরিবেশকে বোঝানো হয়, যেখানে সব রাজনৈতিক দল ও প্রার্থী সমান সুযোগ, অধিকার এবং নিরাপত্তা ভোগ করবে। অর্থাৎ কোনো দলের জন্য বাড়তি সুবিধা বা অন্য দলের জন্য বাধা তৈরি না করে নির্বাচন হবে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক। এই পরিবেশ নিশ্চিত না হলে ভোটারদের মধ্যেও আস্থার সংকট তৈরি হয় বলে মনে করেন নির্বাচন বিশ্লেষকরা।
নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতে, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা। সব দলের সভা-সমাবেশ ও প্রচারণায় সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসনিক আচরণ—এসব বিষয়কে তারা মৌলিক মানদণ্ড হিসেবে দেখছেন।
এ ছাড়া গণমাধ্যমের স্বাধীন ভূমিকাও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করা হয়। সব দলের বক্তব্য ও প্রচারণা প্রচারের ক্ষেত্রে সমান সুযোগ, সাংবাদিকদের হয়রানি না করা এবং অবাধ সংবাদ কাভারেজ নিশ্চিত করাকে সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশের পূর্বশর্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে ভুয়া তথ্য ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থার কথাও বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দৃষ্টিতেও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের অর্থ প্রায় একই। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কমনওয়েলথ ও কার্টার সেন্টারের মতো সংস্থাগুলোর মতে, নির্বাচন আইন ও বিধি সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ না হলে কিংবা আইন থাকলেও বাস্তবে তা কার্যকর না হলে নির্বাচনকে সমতাভিত্তিক বলা যায় না। ভোটাররা যেন ভয়মুক্ত পরিবেশে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারেন—এটাই তাদের প্রধান বিবেচ্য।
এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, পুরোপুরি নিখুঁত লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হয়তো বাস্তবে সম্ভব নয়। তবে বড় ধরনের বৈষম্যের অভিযোগ ওঠার সুযোগ না থাকলে সেটিকে মোটামুটি সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র বলা যেতে পারে। তিনি বলেন, নির্বাচনকালীন সময়ে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, নির্বাচন কমিশন ও গণমাধ্যম—সব পক্ষকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।
এরই মধ্যে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে অভিযোগ তুলেছে কয়েকটি রাজনৈতিক দল। জাতীয় নাগরিক পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী দাবি করেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সব দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত হয়নি। তাদের অভিযোগ, বিশেষ একটি দলকে সুবিধা দেওয়ার ইঙ্গিত মিলছে, যা নির্বাচনি পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
তবে নির্বাচন কমিশন এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশজুড়ে ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি কমিটি সক্রিয় রয়েছে এবং যে কোনো অভিযোগ নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গ্রহণ ও নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। কমিশনের দাবি, অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস স্পষ্ট করে বলেছেন, আসন্ন নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকবে। তার মতে, নির্বাচন ঘিরে বড় ধরনের কোনো বৈষম্য বা প্রতিবন্ধকতা দেখা দেবে না এবং প্রচারণা শুরু হলে এই বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।

আপনার মতামত লিখুন :