আওয়ামী লীগ শাসনামলে অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, এই তিনটি নির্বাচন ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সুপরিকল্পিত মাস্টারপ্ল্যানের অংশ। তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণের আগেই রাতে ব্যালট পেপারে সিল মারা হয়েছিল।
সোমবার প্রধান উপদেষ্টার কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার সামনে আয়োজিত ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য তুলে ধরেন তদন্ত কমিটির প্রধান, হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন। তিনি বলেন, এই নির্বাচনগুলোকে প্রভাবিত করতে পুলিশ প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন এবং গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এর ফলে নির্বাচন কমিশনের পরিবর্তে প্রশাসনই কার্যত নির্বাচন পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ নেয়।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের নির্বাচনকে তথাকথিত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক দেখাতে একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো সেই পরিকল্পনা পুরোপুরি বুঝতে না পেরেই নির্বাচনে অংশ নেয়। আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করতে প্রশাসনের ভেতরে এক ধরনের অসৎ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়, যার ফলে কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি শতভাগেরও বেশি দেখানো হয়।
২০২৪ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে তদন্ত কমিটির প্রধান বলেন, বিরোধী দলগুলো নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করা হয়। নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক দেখাতে ডামি প্রার্থী দাঁড় করানো হয় এবং ক্ষমতাসীন দলের মধ্য থেকেই বিদ্রোহী প্রার্থী তৈরি করা হয়।
শামীম হাসনাইন জানান, এই তিনটি নির্বাচনের পরিকল্পনা ছিল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তের ফল। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য পুলিশ প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন এবং গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে ব্যবহার করে বিশেষ ‘নির্বাচন সেল’ গঠন করা হয়। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে ধাপে ধাপে নির্বাচন ব্যবস্থাকে নির্বাচন কমিশনের হাত থেকে সরিয়ে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, এই মাস্টারপ্ল্যানের সূচনা ঘটে ২০০৮ সালের পর। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পেছনেও ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল, যার উদ্দেশ্য ছিল যেকোনো উপায়ে ক্ষমতাসীন দলকে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় রাখা। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের পর গঠিত নির্বাচন কমিশনগুলোও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যদিও তিনটি নির্বাচন একটি মাস্টারপ্ল্যানের অধীনে হয়েছিল, তবে প্রতিটি নির্বাচনের ধরন ছিল আলাদা। ২০১৪ সালের নির্বাচন ছিল অংশগ্রহণহীন, ২০১৮ সালের নির্বাচন ছিল সহিংসতা, ভয়ভীতি ও ভোট কারচুপিতে পরিপূর্ণ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে ডামি প্রার্থীর কৌশল নেওয়া হয়। বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে শত শত মামলা, গ্রেপ্তার এবং জামিন না দেওয়ার মাধ্যমে বিচার বিভাগকেও কার্যত এই প্রক্রিয়ার অংশ করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন :