প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলমান তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সংকট এখনো কাটেনি। সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে দফায় দফায় আলোচনা হলেও কার্যকর কোনো সমাধান দৃশ্যমান নয়। সরকার একদিকে বলছে প্রয়োজনে নিজেরাই এলপিজি আমদানিতে যাবে, অন্যদিকে বাস্তবতা হলো—এলপিজি আমদানি, বোতলজাত ও বাজারজাত করার মতো পর্যাপ্ত অবকাঠামো বর্তমানে সরকারি খাতে নেই। ফলে সংকট দ্রুত কাটার সম্ভাবনা কম বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের এলপিজি বাজারের প্রায় ৯৮ শতাংশই নিয়ন্ত্রিত হয় বেসরকারি খাতের মাধ্যমে। সরকারি কোম্পানির অংশ মাত্র ২ শতাংশ। সরকার সরাসরি এলপিজি আমদানিতে জড়িত নয়; গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া কনডেনসেট ও ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে প্রাপ্ত এলপিজি প্রক্রিয়াজাত করে সীমিত পরিসরে সরবরাহ করা হয়। এই সীমাবদ্ধ সক্ষমতার কারণে সংকট মোকাবিলায় সরকারের বিকল্প খুবই কম।
জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, এলপিজি সংকট নিরসনে সরকার তার পক্ষ থেকে সব ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক ও পরিবেশক সমিতির সঙ্গে আলোচনা হলেও সংকট কাটাতে আমদানি বাড়ানো ছাড়া বাস্তব কোনো পথ নেই। এজন্য বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তবে খাত-সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকার নিজে এলপিজি আমদানি শুরু করলেও তাতে দ্রুত সুফল পাওয়া কঠিন। কারণ আমদানির পর এলপিজি বোতলজাত করে সারাদেশে বিতরণ করতে বড় আকারের অবকাঠামো ও সময় প্রয়োজন হয়। বিদ্যমান ব্যবস্থায় বিকল্প কোনো কোম্পানির অব্যবহৃত অবকাঠামো ব্যবহার করাও সহজ নয়; সেখানে দরপত্রসহ দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বাধা রয়েছে।
সম্প্রতি এলপিজি ব্যবসায়ীদের আর্থিক সংকট লাঘবে সরকার এলসি খোলার পর ২৭০ দিনের সময় দিয়ে ঋণ গ্রহণের সুযোগ দিয়েছে এবং ভ্যাট কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। তবে এসব সিদ্ধান্তের সুফল পেতে হলে নতুন এলসি খুলে এলপিজি দেশে আসতে হবে, যা সাধারণত অন্তত দুই মাস সময় নেয়। ফলে স্বল্পমেয়াদে সংকট কাটার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাত-সংশ্লিষ্ট এক ব্যবসায়ী জানান, দেশের এলপিজি বাজারে সবচেয়ে বিস্তৃত ডিলার নেটওয়ার্ক থাকা বড় কোম্পানিগুলো বর্তমানে পর্যাপ্ত আমদানি করতে পারছে না। অতীতে যেসব প্রতিষ্ঠান বাজারে একচেটিয়া প্রভাব রাখত, সেগুলোর অবস্থাও এখন দুর্বল। আগে সরকারের নানা সহায়তা থাকলেও বর্তমানে সেই সুবিধা না থাকায় সরবরাহ সংকট আরও প্রকট হচ্ছে।
তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ২৩টি কোম্পানির মধ্যে মাত্র ১০টি এলপিজি আমদানি করতে পেরেছে। বাকি ১৩টি কোম্পানি নানা আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে আমদানিতে যেতে পারেনি। ফলে বাজারে সরবরাহ কমে গিয়ে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, যা মজুতদারির প্রবণতা বাড়িয়ে সংকট আরও তীব্র করে তোলে।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহসভাপতি হুমায়ুন রশীদ জানান, দেশে মোট ২৮টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত এলপিজি কোম্পানি থাকলেও নিয়মিত আমদানিতে সক্ষম ছিল মাত্র সাত থেকে আটটি প্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি অল্প অল্প করে কার্গো আসতে শুরু করেছে এবং আগামী ১০ থেকে ১২ দিনের মধ্যে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম বলেন, দামের চেয়েও বড় সমস্যা হলো সরবরাহ সংকট। চাহিদা অনুযায়ী এলপিজি না থাকলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়বেই। তিনি বলেন, আমদানির ক্ষেত্রে যেসব বাধা রয়েছে, সেগুলো দ্রুত দূর করতে হবে এবং প্রয়োজনে সরকারকে বাস্তবসম্মত ছাড় দিতে হবে।
বর্তমানে সরকারি এলপিজি উৎপাদন ক্ষমতা খুবই সীমিত। চট্টগ্রাম ও সিলেটের কৈলাশটিলায় অবস্থিত দুটি প্ল্যান্ট মিলিয়ে বছরে উৎপাদন হয় মাত্র ৩৩ হাজার মেট্রিক টন। অথচ দেশে বার্ষিক এলপিজির চাহিদা প্রায় ১২ থেকে ১৬ লাখ মেট্রিক টন। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সক্ষমতা বাড়ানোর কথা বলা হলেও বাস্তবে তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় সংকট বারবার ফিরে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন :