কিছুদিন পরেই হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কিন্তু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন বাড়ছে সহিংসতা, হানাহানি অন্যদিকে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য সোশ্যাল মিডিয়াতে গুজবের ছড়াছড়ি ও দেশের বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতা বৃদ্ধি পেয়েছে। নির্বাচনী জনসভা কিংবা প্রচারণার সময় সংঘর্ষ, হেনস্তার শিকার হচ্ছে রাজনৈতিক কর্মীরা। বিশেষ করে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নারী কর্মীদের প্রচারণা করতে বাধা দিচ্ছে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল এবং শারীরিক ও মানসিক ভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে।
ডিসমিসল্যাবের গবেষণায় আরও দেখা যায়, ২০২৫ সালে অনলাইনে ছড়ানো চার হাজারের বেশি অপতথ্যের মধ্যে দুই হাজার ৩৯১টিই রাজনৈতিক—যা মোটের প্রায় ৫৮ শতাংশ। ভিডিও কনটেন্টের মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে এবং সেগুলোর বড় অংশই এআই দিয়ে তৈরি। দেশে সক্রিয় নয়টি তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের পাঁচ হাজারের বেশি যাচাই প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এই চিত্র উঠে এসেছে। ফেসবুকই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যেখানে প্রতি দশটি ফ্যাক্টচেকের অন্তত একটি ছিল এআই-তৈরি বিভ্রান্তিকর তথ্য নিয়ে।
ফ্যাক্টচেকিং সংস্থা ডিসমিসল্যাব, রিউমার স্ক্যানার, ফ্যাক্ট ওয়াচ ও দ্যা ডিসেন্ট এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে দেখা গেছে, নামকরা সংবাদমাধ্যমের লোগো নকল করে ভুয়া ফটোকার্ড তৈরি করে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। আবার কোনো পুলিশ কর্মকর্তার কথিত ভিডিও ভাইরাল হলেও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে সেটিকে ‘ডিপফেক’ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এমনকি কৃত্রিম চরিত্র দাঁড় করিয়ে ভুয়া জনমত জরিপ প্রকাশের ঘটনাও ঘটছে, যেখানে দাবি করা হচ্ছে নির্দিষ্ট দল বিপুল ভোটে জয়ী হবে। বিদেশি নেতাদের এআই ভিডিও ব্যবহার করেও নির্বাচনি প্রভাব তৈরির চেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে।
এদিকে অনলাইনের উত্তেজনা বাস্তব জগতেও প্রতিফলিত হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়া গুজব ও অতিরঞ্জিত প্রচারণার জেরে সংঘর্ষ, হামলা ও মব সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। শেরপুরে বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীদের পাল্টাপাল্টি হামলায় রেজাউল করিম নামে এক জামায়াত নেতা নিহত হয়েছেন। তিনি শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ছিলেন। স্থানীয়দের দাবি, সামান্য বিষয় থেকে শুরু হলেও মসজিদে মাইকিংয়ের মাধ্যমে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
তাছাড়া, রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যের ভিডিও কাটছাঁট করে অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। দেখা গেছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যের মূল অংশ বাদ দিয়ে বিচ্ছিন্ন কথা কাটছাঁট করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ব্যাপক প্রচার করা হচ্ছে। তাছাড়া, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও প্রার্থীদের একাউন্ট থেকে পোস্ট করলে বট ও ফেক রিয়েক্ট দিচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে বট অ্যাটাক করে একাউন্ট নষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি দেখা গেছে প্রার্থীদের ইমেইল অ্যাড্রেসে বিভিন্ন ফিশিং লিঙ্ক দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে বিভিন্ন আপত্তিকর পোস্ট করে সাধারণ নাগরিকদের বিভ্রান্ত করার পায়তারা করা হচ্ছে।
এদিকে অনলাইনের উত্তেজনা বাস্তব জগতেও প্রতিফলিত হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়া গুজব ও অতিরঞ্জিত প্রচারণার জেরে সংঘর্ষ, হামলা ও মব সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। শেরপুরে বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীদের পাল্টাপাল্টি হামলায় রেজাউল করিম নামে এক জামায়াত নেতা নিহত হয়েছেন। তিনি শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ছিলেন। স্থানীয়দের দাবি, সামান্য বিষয় থেকে শুরু হলেও মসজিদে মাইকিংয়ের মাধ্যমে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এই পরিস্থিতিতে ভুয়া খবর ছড়ানো হয় যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি র একজন নেতা নিহত হয়েছে চিকিৎসা চলাকালীন সময়ে। এবং এই নিয়ে আবার নতুন করে আরও বেশি উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু পরক্ষণে দেখা যায়, যার মারা যাওয়ার খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে সে নিজেই ফেসবুক লাইভ করে সবাইকে নিশ্চিত করেছে যে সে জীবিত আছে এবং সুস্থ আছে।
সম্প্রতি দেখা গেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের এক্স (টুইটার) একাউন্ট হ্যাক করে অপতথ্য ছড়িয়ে সাধারণ নাগরিকদের বিভ্রান্ত করা হয়েছে। এর জের ধরে অনলাইন অফলাইনে জামায়াত ও বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা মিছিল ও পাল্টা মিছিল করছে।
অন্যদিকে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে জমি নিয়ে পারিবারিক বিরোধের জেরে মাহমুদুর রহমান কামাল নিহত হলেও সামাজিক মাধ্যমে ঘটনাটিকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে রাজনৈতিক হামলা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা চলে। আচমিতা ইউনিয়নের পশ্চিম ভিটাদিয়া গ্রামের বাসিন্দা ও স্থানীয় বিএনপির সাবেক নেতা কামাল গুরুতর আহত হওয়ার পর ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তদন্তে জানা যায়, দীর্ঘদিনের জমিজমা নিয়ে বিরোধের জের থেকে দুই ভাইয়ের বিরোধের কারণে ভাতিজার আঘাতে এ ঘটনা ঘটে। পরিবারের সদস্যরা প্রকাশ্যে অনুরোধ জানিয়েছেন যেন এই ঘটনাকে রাজনৈতিক রং না দেওয়া হয়। স্থানীয় বিএনপি নেতারাও এটিকে পারিবারিক দ্বন্দ্ব বলেই উল্লেখ করেছেন। পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং দুজনকে আটক করা হয়েছে।
নির্বাচন ঘিরে সবথেকে বেশি গুজব ছড়ানো হচ্ছে দেশের বিভিন্ন জনপ্রিয় মেইনস্ট্রিম জাতীয় দৈনিক পত্রিকা, অনলাইন মিডিয়া ও টিভি চ্যানেলের লোগো ব্যবহার করে ভুয়া ফটোকার্ড করে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া বিশেষ করে ফেইসবুকে ছড়িয়ে দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। তাছাড়া, মেইনস্ট্রিম সংবাদমাধ্যম গুলোর আদলে ভুয়া মিডিয়া খুলে তার মাধ্যমে অপতথ্য ছড়িয়ে জনগণকে বিব্রত করা হচ্ছে।
নির্বাচনকে ঘিরে চারিদিকে বাড়ছে সহিংসতা যা গণতান্ত্রিক পরিবেশকে নষ্ট করছে এবং গণতান্ত্রিক চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকেই শুরু হয়েছে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষ, নারী হেনস্তা সহ নানান বাধা। তফসিল ঘোষণার পরদিন নির্বাচনী প্রচারণা চালানো কালে ঢাকা ৮ আসনের প্রার্থী শহীদ ওসমান হাদির উপর সরাসরি গুলি করা হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শহীদ হন। এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সারাদেশে ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করে।
সারাদেশে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের জেরে নির্বাচনী প্রচারণায় বাধা প্রদান করা হচ্ছে। নারীদের উপর প্রতিপক্ষরা চড়াও হয়ে তাদের শারীরিক মানসিক হেনস্তা করে নির্বাচনী প্রচারণা করতে বাধা দিচ্ছে।
সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি এর একটা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ৫ আগস্টের পর দেশে সংঘটিত রাজনৈতিক সহিংসতার ৯১ দশমিক ৭ শতাংশ ঘটনার সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। একই সময়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ২০ দশমিক ৭ শতাংশ ঘটনায় জড়িত ছিলেন বলে জানিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী ৭.৭ শতাংশ (৪৬টি ঘটনা) এবং নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ১.২ শতাংশ ঘটনায় জড়িত।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১৭ মাসে সারা দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ৬০০টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ১৫৮ জন রাজনৈতিক কর্মী নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৭ হাজার ৮২ জন।
নির্বাচনকে ঘিরে এসব অপতথ্য, গুজব ও দেশের বিভিন্ন জায়গায় নির্বাচনী প্রচারণায় বাধা প্রদান দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে দূষিত করে তুলছে এবং গণতান্ত্রিক চর্চাকে বাধা প্রদান করছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর দায় চাপিয়ে সমাধান সম্ভব নয়। নির্বাচন কমিশনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ভোটারদের মধ্যে ডিজিটাল সচেতনতা বাড়ানো না গেলে এই তথ্য-যুদ্ধের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে। নির্বাচনের প্রাক্কালে তাই প্রশ্ন উঠছে—ডিজিটাল যুগে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সুরক্ষিত রাখতে রাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত? অপতথ্যের এই ঢেউ যদি নিয়ন্ত্রণহীন থাকে, তবে তা কেবল নির্বাচনি পরিবেশ নয়, সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও গভীর হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
লেখা: জাহিদ হাসান
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আপনার মতামত লিখুন :