ঢাকা বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

নির্বাচনের আগে সহিংসতায় উত্তপ্ত দেশ, বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১১:৩৮ দুপুর

ছবি: সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, দেশজুড়ে ততই বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সহিংসতা। ভোটের দিন যত কাছে আসছে, সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতিও তত গভীর হচ্ছে। রাজধানী থেকে জেলা—সর্বত্রই নির্বাচনি সহিংসতার খবর সামনে আসছে।

তফসিল ঘোষণার পরদিন রাজধানীতে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদির হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে নির্বাচনি উত্তাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সরকারের তথ্যমতে, ১১ ডিসেম্বর নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পর থেকে এখন পর্যন্ত নির্বাচনি সহিংসতায় অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন পাঁচ শতাধিক মানুষ।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা আরও তীব্র হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতাও ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। নির্বাচনি প্রচারণা শুরু হওয়ার পর, অর্থাৎ ২১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত অন্তত চারজন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৪১৪ জন। এই সময়ের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ৫১টি।

নির্বাচনি সহিংসতায় নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক নজরুল ইসলাম, শেরপুরের শ্রীবরদীতে জামায়াতে ইসলামীর নেতা রেজাউল করিম, কিশোরগঞ্জের কটিয়াদিতে বিএনপির সাবেক নেতা মো. কামাল উদ্দিন এবং নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজাহর।

রাজনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি ছিনতাই ও অপরাধ বৃদ্ধিও জনমনে শঙ্কা তৈরি করেছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দিনে-রাতে চলাচল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন সাধারণ মানুষ। গণপরিবহন, ব্যস্ত সড়ক এমনকি আবাসিক এলাকাতেও ছিনতাইয়ের অভিযোগ বাড়ছে। পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে কয়েকটি বিদেশি দূতাবাস তাদের নাগরিকদের সতর্কভাবে চলাচলের পরামর্শ দিয়েছে।

পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ১২ ডিসেম্বর থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত সারাদেশে ১৪৪টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সংঘর্ষ, প্রার্থীদের ওপর হামলা, প্রচারণায় বাধা, নির্বাচনি অফিসে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনাও রয়েছে।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জানুয়ারি মাসে দেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ও বিচারহীনতার প্রভাব স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে এই প্রতিবেদনে।

এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনি সহিংসতার বেশিরভাগ ঘটনাই ঘটেছে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। এছাড়া বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

আইন ও সালিশকেন্দ্রের হিসাবে, জানুয়ারি মাসে কমপক্ষে ৭৫টি সংঘর্ষে ১১ জন নিহত এবং ৬১৬ জন আহত হয়েছেন। নির্বাচনি প্রচারণা শুরুর পর সহিংসতার হার আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

এদিকে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব জানিয়েছেন, সহিংসতার ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও নির্বাচন পরিচালনার পরিবেশ আগের সরকারের সময়ের তুলনায় উন্নত। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও কঠোর ও নিরপেক্ষ ভূমিকা না থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. মো. তৌহিদুল হক বলেন, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে শত্রুতায় রূপ দেওয়াই নির্বাচনি সহিংসতার মূল কারণ। তার মতে, সংঘাতপ্রবণ এলাকায় দ্রুত ও সমানভাবে আইন প্রয়োগ না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক খন্দকার রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, নির্বাচনকে ঘিরে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বডিওর্ন ক্যামেরাসহ অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও নাশকতা প্রতিরোধে সারাদেশে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

Link copied!