"হাওর কন্যা " নামে পরিচিত সিলেটের সুনামগঞ্জ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক লীলাভূমি। অসংখ্য হাওর বাউর এবং প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এই জেলাটি। সিলেট বিভাগের ৪ টি জেলার মধ্যে সুনামগঞ্জ বৃহত্তম।এখানে রয়েছে টাঙ্গুয়ার হাওর, নীলাদ্রি লেক, জাদুকাটা নদী,হাওর বিলাস ও শিমুল বাগানের মত জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলো।এই অঞ্চলটিতে রয়েছে পর্যটন শিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনা।একেক ঋতুতে একেক রূপে সেজে ওঠে সুনামগঞ্জ।বসন্তকালে শিমুল ফুলে ফুলে লাল হয়ে সেজে ওঠে এখানকার শিমুল বাগান।দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটকরা আসে এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে।জাদুকাটা নদীর স্বচ্ছ পানি দর্শনার্থীদের মন কেড়ে নেয় ।এর পাশেই রয়েছে ভারতের মেঘালয়ের সবুজ পাহাড়। বর্ষায় এদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র হলো টাঙ্গুয়ার হাওর।এই হাওরে রয়েছে অসংখ্য প্রজাতির মা মাছ। শীতকালে এই হাওরে বসে অতিথি পাখির মিলনমেলা।এর পাশাপাশি এই হাওর গুলোতে বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়।যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় ব্যাপক ভুমিকা রাখে।বাংলাদেশে বোরো ধান উৎপাদনে শীর্ষ ১০ টি জেলা মধ্যে সুনামগঞ্জ একটি। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো দ্রুতহারে এদেশের উন্নয়ন হলেও এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের তেমন পরিবর্তন হয়নি।গত ১৭ টি বছর এই এলাকার মানুষজন উন্নয়নের ছোঁয়া থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন।প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী বদল হলেও বদল হয়না এখানকার মানুষের ভাগ্য।ভোরে ঘুম থেকে উঠে ক্ষেতে যায়, এবং সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে। এভাবেই কাটছে এখানকার মানুষের জীবন।গত ১৭ বছর ফ্যাসিস্ট শাসনামলে সরকার দেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও সুনামগঞ্জের এর তেমন ছোঁয়া লাগেনি।ফ্যাসিস্ট শাসনামলে এই এলাকার জনগণের জন্য নানান বরাদ্দ আসলেও দূর্নীতির জন্য তা জনগণের কাছে পৌঁছায়নি।এই এলাকায় মনোনীত প্রার্থীদের উন্নয়নের চেয়ে লুটপাটে তাদের বেশি নজর ছিলো।এই এলাকায় অনেক গুলো বিল রয়েছে যেগুলো প্রভাবশালীরা ভোগ করত, সাধারণ জনগণ এইসব থেকে বঞ্চিত ছিলো।সুনামগঞ্জের মানুষের ভাগ্য আজও কাঁদা মাটির সাথে মিশে আছে , তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ হওয়ায় এখানকার মানুষদের নানান ভোগান্তিতে পড়তে হয়।অসংখ্য হাওর নিয়ে গঠিত হওয়ার বর্ষায় এই এলাকার এক মাত্র যোগাযোগ ব্যবস্থা নৌকা। বর্ষাকালে এই এলাকায় নৌকা ছাড়া বিকল্প ব্যবস্থা না চিকিৎসা দিতে অনেক দেরি হয়ে যায়।ফলে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে অনেক প্রসূতি ও শিশু। এমনকি অন্যান্য জেলার তুলনায় এই এলাকায় মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হার বেশি। এখানকার অধিকাংশ রাস্তাঘাট ভাঙ্গা এবং মাটির যার ফলে জনগণের অনেক কষ্ট করতে হয়। বর্ষায় হাওর গুলো পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে গেলে এক উপজেলার সাথে অন্য উপজেলার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সুনামগঞ্জের পার্শ্ববর্তী জেলা নেত্রকোনার সাথেও সরাসরি কোনো সড়ক যোগাযোগ নেই। বিশেষ করে ধর্মপাশা উপজেলার গোলকপুর গ্রামে এখনো মাটির কাঁচা রাস্তা যার ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। শিক্ষাক্ষেত্রেও এই জেলাটি অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এখানে শিক্ষার হার অনেক কম। অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক সংকট থাকায় শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত ক্লাস পায়না। এখানে পর্যাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাব রয়েছে এর পাশাপাশি পর্যাপ্ত মনিটরিং এর অভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে ব্যাপক দুর্নীতি দেখা যায়।এছাড়া এখানকার হাসপাতাল গুলোতে তেমন উন্নয়নের ছোঁয়া দেখা যায়, অত্যাধুনিক যন্ত্রের অভাবে অনেক সময় সঠিকভাবে রোগ নির্ণয় করতে পারেনা।ফলে রোগীকে অত্যাধুনিক চিকিৎসার জন্য সিলেটে নিয়ে যেতে হয় এবং রাস্তাঘাট খারাপ হওয়ায় অনেক রোগী পথেই মৃত্যু কোলে ঢলে পড়ে।এই এলাকার মানুষ আজও অবহেলিত, আধুনিক প্রযুক্তি থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন। নতুন কর্মসংস্থান এর অভাবে অনেক তরুণরা বেকার হয়ে বসে আছে। কৃষি ছাড়া এখানে বিকল্প কর্মসংস্থান অনেক কম ।কৃষি এখানকার অধিকাংশ মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে। হাওর গুলোতেও নেই পর্যাপ্ত বাঁধ ।যার ফলে আগাম বন্যার কারণে কৃষকের কষ্টের ফসল নষ্ট হয়ে যায়।বিগত সরকার বাঁধ নির্মাণের জন্য বরাদ্দ দিলেও দুর্নীতির কারণে এখানে পর্যাপ্ত বাঁধ নির্মাণ করা হয়নি। আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে নতুন সরকার গঠিত হবে। নতুন জাতীয় নির্বাচনের প্রার্থীদের ঘিরে এখানকার জনগণের অনেক আশা প্রত্যাশা।দীর্ঘদিন সুবিধা বঞ্চিত ও পিছিয়ে থাকায় জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থীদের উপর এখানকার জনগণের অনেক আশা প্রত্যাশা রয়েছে।তবে কি সরকার পরিবর্তনে বদলাবে এই এলাকার ভাগ্য,নাকি আগের মত অবহেলিতই থেকে যাবে সুনামগঞ্জ। এখানকার জনগণ আর অবহেলিত থাকতে চায় না।তারা চায় দেশের সাথে তাল মিলিয়ে এই জেলাকেও আধুনিকীকরণ করা হোক।এই অঞ্চলের মানুষ চায় নতুন সরকারের হাত ধরে তাদের ভাগ্য পরিবর্তন হোক। এখানে পর্যটন শিল্পের জন্য নতুন উদ্যোগ নিলে এবং আরো উন্নয়ন করলে পর্যটন শিল্পের এক ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়াও রাস্তাঘাট সংস্কার করা হলে অন্যান্য জেলার সাথে সহজেই যোগাযোগ করা যাবে এবং দীর্ঘসময়ে এর জন্য আর কারো রাস্তায় প্রাণ যাবেনা।এর পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোকে আরো উন্নত করা উচিত কারণ কোনো এলাকার উন্নয়ন করতে গেলে সবার আগে ঐ এলাকার শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন। তবেই দেশ আরো এগিয়ে যাবে। এছাড়াও রোগীদের সুবিধার্থে এখানে আরো হাসপাতাল তৈরি করা উচিত এবং হাসপাতাল গুলোতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে যেন চিকিৎসার জন্য দূরে না যেতে হয়।মনে রাখতে হবে কোনো একটি বিশেষ অঞ্চলকে পিছিয়ে রেখে দেশ কখনোই এগিয়ে যেতে পারে না।সোনার বাংলা গড়তে হলে দেশের প্রতিটি অঞ্চলকে উন্নত করতে হবে। তবেই দেশ আরো এগিয়ে যাবে।
নুসরাত জাহান বৈশাখী
ইংরেজি বিভাগ
শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ

আপনার মতামত লিখুন :