ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
মাঘেই গরমের ছোঁয়া

রাজধানী ঢাকা থেকে কি আগেভাগেই বিদায় নিল শীত?

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ০৪:৩৫ দুপুর

ছবি: সংগৃহীত

বাংলা ক্যালেন্ডারে এখনো মাঘ মাস চলছে, অথচ রাজধানী ঢাকায় শীতের স্বাভাবিক উপস্থিতি যেন ইতোমধ্যেই ফিকে হয়ে গেছে। ‘মাঘের শীতে বাঘ কাঁপা’ প্রবাদটি এবার আর বাস্তবে মিলছে না। উল্টো দুপুরের রোদে ঘাম ঝরছে নগরবাসীর, আর জানুয়ারির শেষ থেকেই অনেককে ফ্যান বা এসির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

আবহাওয়া বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ের পর থেকেই ঢাকায় শীতের তীব্রতা দ্রুত কমতে শুরু করে। ফেব্রুয়ারির শুরুতেই যেখানে রাতের তাপমাত্রা ১২ থেকে ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে থাকার কথা, সেখানে চলতি সপ্তাহে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রির নিচে নামেনি। দিনের বেলায় পারদ উঠছে ২৮ থেকে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত, যা সাধারণত মার্চের শেষ বা এপ্রিলের আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে ঢাকায় ১৫ ডিগ্রির নিচে তাপমাত্রা নেমে আসা দিনের সংখ্যা গড়ে প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ঢাকার গড় তাপমাত্রা ছিল সাম্প্রতিক কয়েক বছরের গড়ের চেয়ে প্রায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল ব্যতিক্রমী কোনো আবহাওয়া নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট ও উদ্বেগজনক ইঙ্গিত।

আবহাওয়াবিদরা বলছেন, প্রশান্ত মহাসাগরীয় এল-নিনো পরিস্থিতির প্রভাবে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকছে। ফলে সাইবেরিয়া ও হিমালয় অঞ্চল থেকে আসা উত্তর-পশ্চিমা শীতল বাতাস বাংলাদেশে প্রবেশ করলেও ঢাকার উষ্ণ বলয় ভেদ করতে পারছে না। একই সঙ্গে ঋতুর স্থায়িত্বও কমে আসছে—যেখানে একসময় শীত আড়াই থেকে তিন মাস স্থায়ী হতো, সেখানে এখন তা এক মাসেরও কম সময়ে সীমিত হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ আফরোজা সুলতানা জানিয়েছেন, শীত কম অনুভূত হওয়ার অন্যতম কারণ কুয়াশার পরিমাণ কমে যাওয়া। কুয়াশা না থাকায় সূর্যের আলো সরাসরি ভূপৃষ্ঠে পৌঁছে দ্রুত তাপমাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ডিসেম্বরের পর জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকেই ঢাকায় এই প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং জানুয়ারির শেষ দশকে কার্যত শীত আর অনুভূত হয়নি।

শীত কমে যাওয়ার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে নগরভিত্তিক ‘আরবান হিট আইল্যান্ড ইফেক্ট’। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বহুতল ভবন, পিচঢালা সড়ক এবং জলাশয় ভরাটের ফলে শহরটি একটি তাপীয় দ্বীপে পরিণত হয়েছে। দিনে ভবন ও রাস্তা সূর্যের তাপ শোষণ করে এবং রাতে সেই তাপ পরিবেশে ছেড়ে দেয়। ফলে আশপাশের গ্রামীণ এলাকায় শীত থাকলেও ঢাকা শহরের ওপর একটি উষ্ণ আবরণ তৈরি হয়ে থাকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের চেয়ারম্যান ড. কাজী মো. ফজলুল হক মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। তবে কার্বন নিঃসরণ কমানো, পরিবেশবান্ধব নগরায়ণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে ক্ষতির মাত্রা কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

এদিকে বন অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান আরও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। রাজধানীতে প্রায় ৩ দশমিক ৬৬ কোটি মানুষের বিপরীতে গাছের সংখ্যা মাত্র ১৩ লাখ। অর্থাৎ গড়ে প্রতি ২৮ জন মানুষের জন্য রয়েছে একটি গাছ, যা পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার জন্য অত্যন্ত অপর্যাপ্ত। বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, দ্রুত বনায়ন বৃদ্ধি না করা হলে ঢাকার তাপমাত্রা ও অক্সিজেন সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের মত, মাঘ মাসেই ঢাকায় বসন্তের উষ্ণতা অনুভূত হওয়া ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্ক সংকেত। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও সবুজ কমে যাওয়ার এই সমন্বিত প্রভাব মোকাবিলায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে রাজধানীর শীত হয়তো ভবিষ্যতে শুধু স্মৃতিতেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।

Link copied!