দৈনিক পরিবর্তন সংবাদ

আরতি, যজ্ঞ ও ধুনুচি নাচে মুখর ছিল মণ্ডপ

মহানবমীর পূজা শেষে বিদায়ের সুর

মহানবমীর পূজা শেষে বিদায়ের সুর

শারদীয় দুর্গোৎসবের মহানবমী তিথিতে পূজা, যজ্ঞ, আরতি ও ধুনুচি নাচে মুখর ছিল রাজধানীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপ। ঢাকের বাদ্য, ধূপের ধোঁয়া আর ভক্তদের প্রার্থনায় উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। তবে পূজার শেষলগ্ন ঘনিয়ে আসায় আনন্দের পাশাপাশি মণ্ডপে মণ্ডপে বাজতে শুরু করেছে বিদায়ের সুর। আজ বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।


নবমীর পূজা ও যজ্ঞে দেবীর আরাধনা

মহানবমী উপলক্ষে রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরে বিশেষ পূজা ও যজ্ঞের আয়োজন করা হয়। শালগ্রাম শিলা ও দেবীর মহাস্নানের মধ্য দিয়ে সকালে শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। পরে ষোড়শ উপাচার ও বিহিত পূজার মাধ্যমে দেবী দুর্গার নবম রূপ মা সিদ্ধিদাত্রীর আরাধনা করেন পুরোহিতরা। সকাল থেকেই অনেক ভক্ত উপবাস পালন করে দেবীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদন করেন।

পূজা উপলক্ষে মন্দির প্রাঙ্গণে ভক্তদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। নীলকণ্ঠ ফুল, যজ্ঞ এবং বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় আচার পালন করা হয়। পূজা শেষে দেবীর উদ্দেশে ভোগ নিবেদন এবং ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়।


অন্তরের অশুভ শক্তি বিনাশের প্রার্থনা

সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির পরিষদের পুরোহিত শ্রী চন্দন চক্রবর্তী বলেন, বিজয়া দশমীতেই দুর্গাপূজার সমাপ্তি হবে। সে কারণে মহানবমীতে পূর্ণপূজার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কলিযুগে মানুষের প্রকৃত শত্রু কেবল বাইরের কেউ নয়; মানুষের ভেতরে থাকা কুপ্রবৃত্তিও বড় শত্রু। নবমীর পূজায় অশুভ শক্তির বিনাশ এবং মানুষের অন্তরের শুভ শক্তি জাগ্রত হওয়ার প্রার্থনা করা হয়।

হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠার প্রতীক। তাই মহানবমীর পূজায় ধর্মীয় আচার পালনের পাশাপাশি শান্তি, মঙ্গল ও কল্যাণ কামনা করেন ভক্তরা।


ধুনুচি নাচে উৎসবের আমেজ

মহানবমীর সন্ধ্যায় সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় ঐতিহ্যবাহী ধুনুচি নাচের। কাঁসা ও ঢাকের তালে ধূপ-ধুনোর ধোঁয়ায় উৎসবমুখর হয়ে ওঠে মন্দির এলাকা। শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের ভক্ত ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে সৃষ্টি হয় আনন্দঘন পরিবেশ।

তবে সেই আনন্দের মধ্যেও ছিল বিদায়ের অনুভূতি। কয়েক দিনের পূজা, প্রার্থনা ও মিলনমেলার পর দেবীকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি নিতে দেখা যায় ভক্তদের। অনেকের কাছে দুর্গোৎসব কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং পরিবার-পরিজন ও পরিচিতজনদের সঙ্গে মিলিত হওয়ারও বিশেষ উপলক্ষ।


সুষ্ঠুভাবে পূজা সম্পন্ন, দশমীতে বিসর্জন

সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির কমিটির যুগ্ম সম্পাদক দিব্যেন্দু শেখর অর্ঘ্য জানান, মহানবমীর পূজা ও যজ্ঞ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ভোগ নিবেদনের পর ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা এবং সার্বিক পরিস্থিতির কারণে এবারের পূজা সুন্দর ও নিরবচ্ছিন্নভাবে উদ্‌যাপন করা সম্ভব হয়েছে বলেও জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, বিজয়া দশমীতে প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রার মাধ্যমে ওয়াইজঘাটের উদ্দেশে যাত্রা করা হবে। সেখানে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে।


দশমীতে সিঁদুর খেলা ও প্রতিমা বিসর্জন

দুর্গোৎসবের শেষ দিন বিজয়া দশমীতে বিহিত পূজার পাশাপাশি সিঁদুর খেলা, দেবীকে মিষ্টি নিবেদন, শোভাযাত্রা ও প্রতিমা বিসর্জনের আয়োজন থাকে। দেবীকে বিদায় জানানোর এই দিনে ভক্তদের মধ্যে একদিকে যেমন আনন্দ থাকে, অন্যদিকে তেমনি ফিরে আসে বিষাদের অনুভূতি।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে পরাজিত করে অশুভ শক্তির বিনাশ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার বার্তা নিয়ে পৃথিবীতে আসেন। সন্তানদের নিয়ে কয়েকটি দিন মর্ত্যে কাটিয়ে তিনি আবার কৈলাশে ফিরে যান। তাই বিজয়া দশমী একদিকে দেবীর বিদায়ের দিন, অন্যদিকে আগামী বছর তাঁকে আবার বরণ করে নেওয়ার প্রত্যাশারও সূচনা।


দুর্গোৎসবের পেছনে পৌরাণিক কাহিনি

হিন্দু ধর্মীয় পুরাণ অনুসারে, ত্রেতাযুগে স্ত্রী সীতাকে উদ্ধারের উদ্দেশ্যে ভগবান রাম শরৎকালে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবীর আশীর্বাদ নিয়ে রাবণকে পরাজিত করে সীতাকে উদ্ধার করেন তিনি। শরৎকালে দেবীকে আহ্বান করার ঐতিহ্য থেকেই শারদীয় দুর্গাপূজার প্রচলন বলে মনে করা হয়।

ধর্মীয় আচার, প্রার্থনা, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও পারস্পরিক সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে মহানবমীর আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে। আজ বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসবের। দেবীকে বিদায় জানিয়ে আবারও আগামী বছরের উৎসবের অপেক্ষায় থাকবেন ভক্তরা।

পরিবর্তন সংবাদ/এসআর

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

মহানবমীর পূজা শেষে বিদায়ের সুর
0:00 0:00
1.0x
দৈনিক পরিবর্তন সংবাদ

বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬


মহানবমীর পূজা শেষে বিদায়ের সুর

প্রকাশের তারিখ : ২১ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

শারদীয় দুর্গোৎসবের মহানবমী তিথিতে পূজা, যজ্ঞ, আরতি ও ধুনুচি নাচে মুখর ছিল রাজধানীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপ। ঢাকের বাদ্য, ধূপের ধোঁয়া আর ভক্তদের প্রার্থনায় উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। তবে পূজার শেষলগ্ন ঘনিয়ে আসায় আনন্দের পাশাপাশি মণ্ডপে মণ্ডপে বাজতে শুরু করেছে বিদায়ের সুর। আজ বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা।


নবমীর পূজা ও যজ্ঞে দেবীর আরাধনা


মহানবমী উপলক্ষে রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দিরে বিশেষ পূজা ও যজ্ঞের আয়োজন করা হয়। শালগ্রাম শিলা ও দেবীর মহাস্নানের মধ্য দিয়ে সকালে শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। পরে ষোড়শ উপাচার ও বিহিত পূজার মাধ্যমে দেবী দুর্গার নবম রূপ মা সিদ্ধিদাত্রীর আরাধনা করেন পুরোহিতরা। সকাল থেকেই অনেক ভক্ত উপবাস পালন করে দেবীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদন করেন।


পূজা উপলক্ষে মন্দির প্রাঙ্গণে ভক্তদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। নীলকণ্ঠ ফুল, যজ্ঞ এবং বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় আচার পালন করা হয়। পূজা শেষে দেবীর উদ্দেশে ভোগ নিবেদন এবং ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়।


অন্তরের অশুভ শক্তি বিনাশের প্রার্থনা


সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির পরিষদের পুরোহিত শ্রী চন্দন চক্রবর্তী বলেন, বিজয়া দশমীতেই দুর্গাপূজার সমাপ্তি হবে। সে কারণে মহানবমীতে পূর্ণপূজার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কলিযুগে মানুষের প্রকৃত শত্রু কেবল বাইরের কেউ নয়; মানুষের ভেতরে থাকা কুপ্রবৃত্তিও বড় শত্রু। নবমীর পূজায় অশুভ শক্তির বিনাশ এবং মানুষের অন্তরের শুভ শক্তি জাগ্রত হওয়ার প্রার্থনা করা হয়।


হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গা অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠার প্রতীক। তাই মহানবমীর পূজায় ধর্মীয় আচার পালনের পাশাপাশি শান্তি, মঙ্গল ও কল্যাণ কামনা করেন ভক্তরা।


ধুনুচি নাচে উৎসবের আমেজ


মহানবমীর সন্ধ্যায় সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় ঐতিহ্যবাহী ধুনুচি নাচের। কাঁসা ও ঢাকের তালে ধূপ-ধুনোর ধোঁয়ায় উৎসবমুখর হয়ে ওঠে মন্দির এলাকা। শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের ভক্ত ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে সৃষ্টি হয় আনন্দঘন পরিবেশ।


তবে সেই আনন্দের মধ্যেও ছিল বিদায়ের অনুভূতি। কয়েক দিনের পূজা, প্রার্থনা ও মিলনমেলার পর দেবীকে বিদায় জানানোর প্রস্তুতি নিতে দেখা যায় ভক্তদের। অনেকের কাছে দুর্গোৎসব কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং পরিবার-পরিজন ও পরিচিতজনদের সঙ্গে মিলিত হওয়ারও বিশেষ উপলক্ষ।


সুষ্ঠুভাবে পূজা সম্পন্ন, দশমীতে বিসর্জন


সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির কমিটির যুগ্ম সম্পাদক দিব্যেন্দু শেখর অর্ঘ্য জানান, মহানবমীর পূজা ও যজ্ঞ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ভোগ নিবেদনের পর ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা এবং সার্বিক পরিস্থিতির কারণে এবারের পূজা সুন্দর ও নিরবচ্ছিন্নভাবে উদ্‌যাপন করা সম্ভব হয়েছে বলেও জানান তিনি।


তিনি আরও বলেন, বিজয়া দশমীতে প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রার মাধ্যমে ওয়াইজঘাটের উদ্দেশে যাত্রা করা হবে। সেখানে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে।


দশমীতে সিঁদুর খেলা ও প্রতিমা বিসর্জন


দুর্গোৎসবের শেষ দিন বিজয়া দশমীতে বিহিত পূজার পাশাপাশি সিঁদুর খেলা, দেবীকে মিষ্টি নিবেদন, শোভাযাত্রা ও প্রতিমা বিসর্জনের আয়োজন থাকে। দেবীকে বিদায় জানানোর এই দিনে ভক্তদের মধ্যে একদিকে যেমন আনন্দ থাকে, অন্যদিকে তেমনি ফিরে আসে বিষাদের অনুভূতি।


সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে পরাজিত করে অশুভ শক্তির বিনাশ ও শান্তি প্রতিষ্ঠার বার্তা নিয়ে পৃথিবীতে আসেন। সন্তানদের নিয়ে কয়েকটি দিন মর্ত্যে কাটিয়ে তিনি আবার কৈলাশে ফিরে যান। তাই বিজয়া দশমী একদিকে দেবীর বিদায়ের দিন, অন্যদিকে আগামী বছর তাঁকে আবার বরণ করে নেওয়ার প্রত্যাশারও সূচনা।


দুর্গোৎসবের পেছনে পৌরাণিক কাহিনি


হিন্দু ধর্মীয় পুরাণ অনুসারে, ত্রেতাযুগে স্ত্রী সীতাকে উদ্ধারের উদ্দেশ্যে ভগবান রাম শরৎকালে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবীর আশীর্বাদ নিয়ে রাবণকে পরাজিত করে সীতাকে উদ্ধার করেন তিনি। শরৎকালে দেবীকে আহ্বান করার ঐতিহ্য থেকেই শারদীয় দুর্গাপূজার প্রচলন বলে মনে করা হয়।


ধর্মীয় আচার, প্রার্থনা, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও পারস্পরিক সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে মহানবমীর আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে। আজ বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটবে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসবের। দেবীকে বিদায় জানিয়ে আবারও আগামী বছরের উৎসবের অপেক্ষায় থাকবেন ভক্তরা।

পরিবর্তন সংবাদ/এসআর


দৈনিক পরিবর্তন সংবাদ

উপদেষ্টা সম্পাদক: গোলাম আকবর খন্দকার (সাবেক এমপি)
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: লেঃ কর্নেল এ কে এম রশিদুন্নবী,পিএসসি ( অবঃ)
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ শাহাদাৎ হোসেন

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত