দৈনিক পরিবর্তন সংবাদ

স্নাতকে ইংরেজি নেই ৯ হাজার ৯৮২ শিক্ষকের, গণিত নেই ১০ হাজার ১৬৯ জনের পেশাগত প্রশিক্ষণ নেই প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষকের

মাধ্যমিকে ইংরেজি-গণিত পড়াচ্ছেন ২০ হাজারের বেশি অযোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক

মাধ্যমিকে ইংরেজি-গণিত পড়াচ্ছেন ২০ হাজারের বেশি অযোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক

দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ইংরেজি ও গণিত শিক্ষার মান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্নাতক পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনা না করেও এসব বিষয়ে পাঠদান করছেন ২০ হাজারের বেশি শিক্ষক। এর মধ্যে ইংরেজি পড়ানো ৯ হাজার ৯৮২ জন শিক্ষকের স্নাতক পর্যায়ে ইংরেজি বিষয় ছিল না। একইভাবে গণিত পড়ানো ১০ হাজার ১৬৯ জন শিক্ষকের স্নাতক পর্যায়ে গণিত ছিল না। শুধু বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘাটতিই নয়, মাধ্যমিক স্তরে কর্মরত প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষকের পেশাগত প্রশিক্ষণ না থাকাও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান–২০২৫’ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকসংখ্যা, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং পেশাগত প্রশিক্ষণের বিভিন্ন চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের মতে, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের সংকট এবং পেশাগত প্রশিক্ষণের অভাবের কারণে অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় মানের পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের মৌলিক জ্ঞান অর্জন, পরীক্ষার ফলাফল এবং পরবর্তী শিক্ষাজীবনে।


ইংরেজি পড়াচ্ছেন ৯ হাজার ৯৮২ জন, গণিতে ১০ হাজার ১৬৯ জন

ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ইংরেজি বিষয়ে পাঠদান করেন ৬৪ হাজার ২৫৩ জন শিক্ষক। তাঁদের মধ্যে ৯ হাজার ৯৮২ জন স্নাতক পাস করলেও স্নাতক পর্যায়ে ইংরেজি বিষয়ে পড়াশোনা করেননি। এ ছাড়া ইংরেজি বিষয়ে পাঠদানকারী ৪ হাজার ২১২ জন শিক্ষক উচ্চমাধ্যমিক পাস। বাকি প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষকের স্নাতক, স্নাতক (সম্মান) কিংবা স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ইংরেজি বিষয় রয়েছে।

অন্যদিকে, মাধ্যমিক স্তরে গণিত পড়ানো শিক্ষকের সংখ্যা ৬৭ হাজার ৬৯৭। তাঁদের মধ্যে ১০ হাজার ১৬৯ জন স্নাতক (পাস) হলেও স্নাতক পর্যায়ে গণিত বিষয়ে পড়াশোনা করেননি। প্রায় ২৯ হাজার শিক্ষক স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ে গণিত পড়েছেন। বাকিদের মধ্যে এমন শিক্ষকও রয়েছেন, যাঁদের উচ্চমাধ্যমিক বা ডিগ্রি পর্যায়ে গণিত পড়ার অভিজ্ঞতা থাকলেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই।

সাধারণত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হতে কমপক্ষে স্নাতক পাস হতে হয়। তবে বিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় কোথাও কোথাও অস্থায়ীভাবে উচ্চমাধ্যমিক পাস ব্যক্তিদেরও পাঠদানের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যানবেইসের এক কর্মকর্তা।


শিক্ষকসংকটে অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের দিয়ে পাঠদান

শিক্ষকসংকটের কারণে অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের নিজেদের বিষয়ের বাইরেও অন্য বিষয়ে ক্লাস নিতে হচ্ছে। এতে বিষয়ভিত্তিক পাঠদানের ধারাবাহিকতা ও মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

ঢাকার প্রায় ১৯০ বছরের পুরোনো ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে দুই পালায় পাঠদান করা হয়। বিদ্যালয়টিতে ইংরেজি বিষয়ের আটজন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও কর্মরত আছেন চারজন। গণিতের ছয়টি পদের বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন চারজন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যালয়টির একজন শিক্ষক জানিয়েছেন, গণিতের ক্লাসগুলো ভৌতবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষকেরা সমন্বয় করে নেন। একইভাবে সামাজিক বিজ্ঞান ও ধর্ম বিষয়ের শিক্ষকদেরও ইংরেজি পড়াতে হচ্ছে।

ঢাকার বাইরেও শিক্ষকসংকটের এমন চিত্র রয়েছে। সিলেটের জকিগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে ৪৮৬ জন ছাত্রী পড়াশোনা করছে। অথচ বিদ্যালয়টিতে কর্মরত শিক্ষক মাত্র দুজন। তাঁরা হলেন সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষক ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. ওমর ফারুক এবং ইসলাম শিক্ষার সহকারী শিক্ষক জুলহাস সুজন।

এ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করতে বিদ্যালয়টিতে অস্থায়ীভাবে ছয়জন খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক।


প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষকের পেশাগত প্রশিক্ষণ নেই

বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি শিক্ষকদের পেশাগত প্রশিক্ষণেও ঘাটতি রয়েছে। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৬ হাজার ৭৩৭। এসব বিদ্যালয়ে কর্মরত আছেন ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫৫৭ জন শিক্ষক। তাঁদের প্রায় ৬৫ শতাংশ বিএড, এমএড বা বিপিএডের মতো পেশাগত প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। অর্থাৎ প্রায় ৩৫ শতাংশ শিক্ষকের এ ধরনের প্রশিক্ষণ নেই।

নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতেও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের সংখ্যা কম। দেশে ২ হাজার ৪৭৪টি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২৫ হাজারের বেশি শিক্ষক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে মাত্র ১৯ দশমিক ৫২ শতাংশ পেশাগত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।

এ ছাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষক রয়েছেন ৩৫ হাজারের বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৫১ শতাংশ শিক্ষক পেশাগত প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।

সব ধরনের প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে মাধ্যমিক স্তরে প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষকের পেশাগত প্রশিক্ষণ রয়েছে। বাকি প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষক বিএড, এমএড বা বিপিএডের মতো প্রশিক্ষণের আওতার বাইরে রয়েছেন। বর্তমানে দেশের মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৮৬ লাখ ৩৮ হাজারের বেশি।


শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণে উদ্যোগের কথা

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল জানিয়েছেন, বিদ্যালয়গুলোতে শুধু প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ঘাটতি নয়, সার্বিকভাবেই শিক্ষকসংকট রয়েছে। এ সংকট কাটাতে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি পেশাগত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গণিত শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে ‘খান একাডেমি বাংলাদেশ’-এর মাধ্যমে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে শিক্ষা বিষয়ে ডিগ্রিধারীরা যাতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেতে পারেন, সে ব্যবস্থার পরিকল্পনাও রয়েছে।


পরীক্ষার ফলাফলেও ইংরেজি-গণিতে দুর্বলতার প্রভাব

শিক্ষার্থীদের পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণেও ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে। চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশ, যা ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আগের বছরের তুলনায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে প্রায় ১৯ হাজার।

কুমিল্লা ছাড়া আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৮০ শতাংশের নিচে ছিল। ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার প্রায় ৬৭ শতাংশ এবং গণিতে প্রায় ৭০ শতাংশ। সিলেট শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ছিল প্রায় ৬৯ শতাংশ এবং গণিতে প্রায় ৭৬ শতাংশ।

এমনকি পাসের হারে শীর্ষে থাকা ঢাকা শিক্ষা বোর্ডেও ইংরেজিতে পাসের হার ৭৮ শতাংশের কিছু বেশি ছিল। গত বছর এ হার ছিল প্রায় ৮৮ শতাংশ। ইংরেজি ও গণিত বাধ্যতামূলক বিষয় হওয়ায় এসব বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার প্রভাব পড়েছে সার্বিক ফলাফলে।

শিক্ষাবিদদের মতে, মাধ্যমিক স্তরে ইংরেজি ও গণিতের ভিত্তি দুর্বল হলে পরবর্তী শিক্ষাজীবনেও তার প্রভাব পড়ে। উচ্চশিক্ষায় গিয়েও অনেক শিক্ষার্থী ইংরেজিতে সাধারণ যোগাযোগের ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়েন। গণিতের মৌলিক ধারণা দুর্বল থাকলে উচ্চতর পর্যায়ে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও বিভিন্ন বিশ্লেষণধর্মী বিষয়ে পড়াশোনাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।


বিষয়ভিত্তিক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার তাগিদ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান মনে করেন, শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের আগে পেশাগত প্রশিক্ষণ ও সনদব্যবস্থা থাকা জরুরি। শুধু স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করলেই একজন ব্যক্তি কার্যকরভাবে পাঠদানের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে যান না। শিক্ষার্থীদের বোঝানোর কৌশল, শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা এবং পাঠদানের উপযুক্ত দক্ষতা অর্জনে পেশাগত প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর মতে, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি দ্রুত বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এতে শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ বিষয়ের দক্ষ শিক্ষকের কাছ থেকে পাঠ নেওয়ার সুযোগ পাবে এবং শিখনঘাটতি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকসংকট নিরসন, বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতা অনুযায়ী নিয়োগ এবং পেশাগত প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ইংরেজি ও গণিতের মতো মৌলিক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হতে পারে।

পরিবর্তন সংবাদ/এসআর

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

মাধ্যমিকে ইংরেজি-গণিত পড়াচ্ছেন ২০ হাজারের বেশি অযোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক
0:00 0:00
1.0x
দৈনিক পরিবর্তন সংবাদ

রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬


মাধ্যমিকে ইংরেজি-গণিত পড়াচ্ছেন ২০ হাজারের বেশি অযোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক

প্রকাশের তারিখ : ১৮ অক্টোবর ২০২৬

featured Image


দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ইংরেজি ও গণিত শিক্ষার মান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্নাতক পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পড়াশোনা না করেও এসব বিষয়ে পাঠদান করছেন ২০ হাজারের বেশি শিক্ষক। এর মধ্যে ইংরেজি পড়ানো ৯ হাজার ৯৮২ জন শিক্ষকের স্নাতক পর্যায়ে ইংরেজি বিষয় ছিল না। একইভাবে গণিত পড়ানো ১০ হাজার ১৬৯ জন শিক্ষকের স্নাতক পর্যায়ে গণিত ছিল না। শুধু বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘাটতিই নয়, মাধ্যমিক স্তরে কর্মরত প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষকের পেশাগত প্রশিক্ষণ না থাকাও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।


বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান–২০২৫’ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকসংখ্যা, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং পেশাগত প্রশিক্ষণের বিভিন্ন চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।


শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের মতে, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের সংকট এবং পেশাগত প্রশিক্ষণের অভাবের কারণে অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় মানের পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের মৌলিক জ্ঞান অর্জন, পরীক্ষার ফলাফল এবং পরবর্তী শিক্ষাজীবনে।


ইংরেজি পড়াচ্ছেন ৯ হাজার ৯৮২ জন, গণিতে ১০ হাজার ১৬৯ জন


ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ইংরেজি বিষয়ে পাঠদান করেন ৬৪ হাজার ২৫৩ জন শিক্ষক। তাঁদের মধ্যে ৯ হাজার ৯৮২ জন স্নাতক পাস করলেও স্নাতক পর্যায়ে ইংরেজি বিষয়ে পড়াশোনা করেননি। এ ছাড়া ইংরেজি বিষয়ে পাঠদানকারী ৪ হাজার ২১২ জন শিক্ষক উচ্চমাধ্যমিক পাস। বাকি প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষকের স্নাতক, স্নাতক (সম্মান) কিংবা স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ইংরেজি বিষয় রয়েছে।


অন্যদিকে, মাধ্যমিক স্তরে গণিত পড়ানো শিক্ষকের সংখ্যা ৬৭ হাজার ৬৯৭। তাঁদের মধ্যে ১০ হাজার ১৬৯ জন স্নাতক (পাস) হলেও স্নাতক পর্যায়ে গণিত বিষয়ে পড়াশোনা করেননি। প্রায় ২৯ হাজার শিক্ষক স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ে গণিত পড়েছেন। বাকিদের মধ্যে এমন শিক্ষকও রয়েছেন, যাঁদের উচ্চমাধ্যমিক বা ডিগ্রি পর্যায়ে গণিত পড়ার অভিজ্ঞতা থাকলেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই।


সাধারণত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হতে কমপক্ষে স্নাতক পাস হতে হয়। তবে বিদ্যালয়গুলোতে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকায় কোথাও কোথাও অস্থায়ীভাবে উচ্চমাধ্যমিক পাস ব্যক্তিদেরও পাঠদানের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যানবেইসের এক কর্মকর্তা।


শিক্ষকসংকটে অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের দিয়ে পাঠদান


শিক্ষকসংকটের কারণে অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের নিজেদের বিষয়ের বাইরেও অন্য বিষয়ে ক্লাস নিতে হচ্ছে। এতে বিষয়ভিত্তিক পাঠদানের ধারাবাহিকতা ও মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।


ঢাকার প্রায় ১৯০ বছরের পুরোনো ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে দুই পালায় পাঠদান করা হয়। বিদ্যালয়টিতে ইংরেজি বিষয়ের আটজন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও কর্মরত আছেন চারজন। গণিতের ছয়টি পদের বিপরীতে শিক্ষক রয়েছেন চারজন।


নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যালয়টির একজন শিক্ষক জানিয়েছেন, গণিতের ক্লাসগুলো ভৌতবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষার শিক্ষকেরা সমন্বয় করে নেন। একইভাবে সামাজিক বিজ্ঞান ও ধর্ম বিষয়ের শিক্ষকদেরও ইংরেজি পড়াতে হচ্ছে।


ঢাকার বাইরেও শিক্ষকসংকটের এমন চিত্র রয়েছে। সিলেটের জকিগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে ৪৮৬ জন ছাত্রী পড়াশোনা করছে। অথচ বিদ্যালয়টিতে কর্মরত শিক্ষক মাত্র দুজন। তাঁরা হলেন সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষক ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. ওমর ফারুক এবং ইসলাম শিক্ষার সহকারী শিক্ষক জুলহাস সুজন।


এ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করতে বিদ্যালয়টিতে অস্থায়ীভাবে ছয়জন খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক।


প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষকের পেশাগত প্রশিক্ষণ নেই


বিষয়ভিত্তিক শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি শিক্ষকদের পেশাগত প্রশিক্ষণেও ঘাটতি রয়েছে। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৬ হাজার ৭৩৭। এসব বিদ্যালয়ে কর্মরত আছেন ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫৫৭ জন শিক্ষক। তাঁদের প্রায় ৬৫ শতাংশ বিএড, এমএড বা বিপিএডের মতো পেশাগত প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। অর্থাৎ প্রায় ৩৫ শতাংশ শিক্ষকের এ ধরনের প্রশিক্ষণ নেই।


নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতেও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের সংখ্যা কম। দেশে ২ হাজার ৪৭৪টি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২৫ হাজারের বেশি শিক্ষক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে মাত্র ১৯ দশমিক ৫২ শতাংশ পেশাগত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।


এ ছাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষক রয়েছেন ৩৫ হাজারের বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৫১ শতাংশ শিক্ষক পেশাগত প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।


সব ধরনের প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে মাধ্যমিক স্তরে প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষকের পেশাগত প্রশিক্ষণ রয়েছে। বাকি প্রায় ৪০ শতাংশ শিক্ষক বিএড, এমএড বা বিপিএডের মতো প্রশিক্ষণের আওতার বাইরে রয়েছেন। বর্তমানে দেশের মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৮৬ লাখ ৩৮ হাজারের বেশি।


শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণে উদ্যোগের কথা


মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল জানিয়েছেন, বিদ্যালয়গুলোতে শুধু প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ঘাটতি নয়, সার্বিকভাবেই শিক্ষকসংকট রয়েছে। এ সংকট কাটাতে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে আলোচনা চলছে। পাশাপাশি পেশাগত প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।


তিনি আরও জানান, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গণিত শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে ‘খান একাডেমি বাংলাদেশ’-এর মাধ্যমে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে শিক্ষা বিষয়ে ডিগ্রিধারীরা যাতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেতে পারেন, সে ব্যবস্থার পরিকল্পনাও রয়েছে।


পরীক্ষার ফলাফলেও ইংরেজি-গণিতে দুর্বলতার প্রভাব


শিক্ষার্থীদের পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণেও ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে। চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ছিল ৬৪ দশমিক ০৫ শতাংশ, যা ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। আগের বছরের তুলনায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে প্রায় ১৯ হাজার।


কুমিল্লা ছাড়া আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৮০ শতাংশের নিচে ছিল। ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার প্রায় ৬৭ শতাংশ এবং গণিতে প্রায় ৭০ শতাংশ। সিলেট শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ছিল প্রায় ৬৯ শতাংশ এবং গণিতে প্রায় ৭৬ শতাংশ।


এমনকি পাসের হারে শীর্ষে থাকা ঢাকা শিক্ষা বোর্ডেও ইংরেজিতে পাসের হার ৭৮ শতাংশের কিছু বেশি ছিল। গত বছর এ হার ছিল প্রায় ৮৮ শতাংশ। ইংরেজি ও গণিত বাধ্যতামূলক বিষয় হওয়ায় এসব বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার প্রভাব পড়েছে সার্বিক ফলাফলে।


শিক্ষাবিদদের মতে, মাধ্যমিক স্তরে ইংরেজি ও গণিতের ভিত্তি দুর্বল হলে পরবর্তী শিক্ষাজীবনেও তার প্রভাব পড়ে। উচ্চশিক্ষায় গিয়েও অনেক শিক্ষার্থী ইংরেজিতে সাধারণ যোগাযোগের ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়েন। গণিতের মৌলিক ধারণা দুর্বল থাকলে উচ্চতর পর্যায়ে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও বিভিন্ন বিশ্লেষণধর্মী বিষয়ে পড়াশোনাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।


বিষয়ভিত্তিক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার তাগিদ


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান মনে করেন, শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের আগে পেশাগত প্রশিক্ষণ ও সনদব্যবস্থা থাকা জরুরি। শুধু স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করলেই একজন ব্যক্তি কার্যকরভাবে পাঠদানের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে যান না। শিক্ষার্থীদের বোঝানোর কৌশল, শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা এবং পাঠদানের উপযুক্ত দক্ষতা অর্জনে পেশাগত প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।


তাঁর মতে, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি দ্রুত বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এতে শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ বিষয়ের দক্ষ শিক্ষকের কাছ থেকে পাঠ নেওয়ার সুযোগ পাবে এবং শিখনঘাটতি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।


সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকসংকট নিরসন, বিষয়ভিত্তিক যোগ্যতা অনুযায়ী নিয়োগ এবং পেশাগত প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ইংরেজি ও গণিতের মতো মৌলিক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হতে পারে।

পরিবর্তন সংবাদ/এসআর


দৈনিক পরিবর্তন সংবাদ

উপদেষ্টা সম্পাদক: গোলাম আকবর খন্দকার (সাবেক এমপি)
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: লেঃ কর্নেল এ কে এম রশিদুন্নবী,পিএসসি ( অবঃ)
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ শাহাদাৎ হোসেন

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত