‘আইন’ শব্দের আদি অর্থই হলো শৃঙ্খল ও ন্যায়বিচার। সমাজের দর্পণ হিসেবে পরিচিত যে মহৎ পেশাটি মানুষের মৌলিক অধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার শেষ আশ্রয়স্থল, তা হলো আইন পেশা। সভ্যতার আদি লগ্ন থেকে আইন পেশাকে একটি স্বাধীন, মেধাভিত্তিক ও মৌলিক পেশা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। যেকোনো বয়সে আইনি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বা বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এই মহৎ পেশায় আসার অধিকারকে প্রায় সব আধুনিক রাষ্ট্রই নাগরিকের অবিচ্ছেদ্য মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এমনকি মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত সুস্থ ও সক্রিয় থেকে আইন পেশায় সংযুক্ত থাকতে কোনো বাধা নেই।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের একটি সিদ্ধান্ত দেশের আইন অঙ্গন এবং সচেতন সমাজকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। ২০২৬ সালের ৬ আগস্ট বার কাউন্সিলের ‘লিগ্যাল এডুকেশন কমিটি’ আইনজীবী তালিকাভুক্তির সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩৫ বছর নির্ধারণের একটি বিতর্কিত প্রস্তাব করে। পরবর্তীতে, ১৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখে বার কাউন্সিলের বর্তমান এডহক কমিটির (Ad-hoc Committee) একটি বিশেষ সভায় ১৫ সদস্যের কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে এই সুপারিশটি অনুমোদন করে, যা আগামী ১ জানুয়ারি ২০৩০ থেকে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। বিশ্ব বাস্তবতার সাথে সম্পূর্ণ সংঘাতপূর্ণ এই সিদ্ধান্তটি কেবল বৈষম্যমূলকই নয়, বরং এর পেছনে গভীর নীতিনির্ধারণী অদূরদর্শিতা রয়েছে কিনা—তা আজ বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বৈশ্বিক নজির ও ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিলঃ
বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রসমূহ কিংবা আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, আইনজীবী হিসেবে নিবন্ধিত বা তালিকাভুক্ত (Bar Enrollment) হওয়ার জন্য কোনো সর্বোচ্চ বয়সসীমা নেই।
১. ভারত: ১৯৯৪ সালে বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া (BCI) আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির জন্য সর্বোচ্চ ৪৫ বছর বয়সসীমা নির্ধারণের একটি নিয়ম (Rule 9) চালু করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ১৯৯৫ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট Indian Council of Legal Aid and Advice v. Bar Council of India ঐতিহাসিক মামলায় এই নিয়মটিকে সম্পূর্ণ বেআইনি, অযৌক্তিক এবং ভারতীয় সংবিধানের পরিপন্থী ঘোষণা করে বাতিল করে দেয়। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল, অবসরের পরও যে কেউ চাইলে মেধা ও যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে আইন পেশায় আসতে পারেন; বয়স কখনো মেধার পরিমাপক হতে পারে না।
২. পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা: পাকিস্তানের সংবিধানের ১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের যেকোনো বৈধ পেশা বেছে নেওয়ার মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত। পাকিস্তান বার কাউন্সিল (PBC) কর্তৃক নির্ধারিত নিয়ম অনুসারে, যে কেউ ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা (LL.B.) অর্জন করে বার পরীক্ষায় পাস করার মাধ্যমে যেকোনো বয়সে আইনজীবী হতে পারেন। শ্রীলঙ্কার আইন অনুযায়ীও আইনজীবী (Attorney-at-Law) হিসেবে তালিকাভুক্তির কোনো বয়সসীমা রাখা হয়নি।
৩. আমেরিকা ও যুক্তরাজ্য: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আইনজীবী (Attorney) হিসেবে প্র্যাকটিস করার জন্য কোনো সর্বোচ্চ বয়সসীমা নেই। যেকোনো বয়সে ল স্কুল অ্যাডমিশন টেস্ট (LSAT) দিয়ে আইন স্কুলে ভর্তি হওয়া যায় এবং বার পরীক্ষায় বসা যায়। যুক্তরাজ্যে (ইংল্যান্ড ও ওয়েলস) ব্যারিস্টার বা সলিসিটর হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার ক্ষেত্রে বয়স কোনো বাধা নয়। মধ্য-বয়সে বা সরকারি-বেসরকারি চাকরি জীবনের শেষ ভাগে এসে আইন পেশায় ক্যারিয়ার পরিবর্তন করার ঘটনা সেখানে অত্যন্ত স্বাভাবিক ও প্রশংসিত।
৪. ইউরোপের দেশসমূহ: ফ্রান্স, জার্মানি বা ইতালির মতো ইউরোপীয় দেশগুলোতে আইনজীবী হিসেবে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে কোনো সর্বোচ্চ বয়সসীমা নেই। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) মানবাধিকার ও বৈষম্যবিরোধী আইন অনুযায়ী বয়স বা লিঙ্গের ভিত্তিতে কারও পেশা নির্বাচনের অধিকারকে খর্ব করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
আইনি এখতিয়ার ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণঃ
আইনজীবী ও দার্শনিক সিসিরো (Cicero) বলেছিলেন, "The good of the people is the chief law" অর্থাৎ জনগণের কল্যাণই হলো প্রধান আইন। বার কাউন্সিল কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্তের পেছনে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি মামলার (Civil Petition for Leave to Appeal No. 253/2014) পর্যবেক্ষণকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করলেও, আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এই সিদ্ধান্তের এখতিয়ার নিয়েই বড় প্রশ্ন রয়েছে।
'The Bangladesh Legal Practitioners and Bar Council Order, 1972'—এর ২৭(১)(বি) অনুচ্ছেদ [Article 27(1)(b)] অনুযায়ী, আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির জন্য শুধুমাত্র ন্যূনতম বয়স ২১ বছর নির্ধারণ করা আছে। মূল আইনে সর্বোচ্চ কোনো বয়সসীমার উল্লেখই নেই। আইনশাস্ত্রের সর্বজনীন নীতি হলো, মূল আইন (Parent Act) যেখানে কোনো সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ করেনি, সেখানে কোনো নিয়ামক সংস্থা তার অধীনস্থ বিধিমালা (Rules) তৈরি করে মূল আইনের পরিপন্থী কোনো সীমাবদ্ধতা বা 'সর্বোচ্চ বয়সসীমা' চাপিয়ে দিতে পারে না। এটি স্পষ্টত Ultra Vires বা আইনি এখতিয়ার বহির্ভূত একটি পদক্ষেপ। আইন পেশা কোনো সাধারণ সরকারি চাকরি নয় যে এখানে বয়সের অজুহাতে মেধাবীদের পথ রুদ্ধ করা যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত বিচারপতি ফেলিক্স ফ্রাঙ্কফুর্টার (Felix Frankfurter) পঞ্চাশ বছর বয়সে পৌঁছানোর পর তাঁর বিচারিক জীবনে যে প্রজ্ঞা দেখিয়েছেন, তা বিশ্বখ্যাত। তিনি বিশ্বাস করতেন, জীবনের অভিজ্ঞতা আইনি ব্যাখ্যাকে সমৃদ্ধ করে। একজন ব্যক্তি সামরিক বাহিনী, আমলাতন্ত্র, ব্যাংক, কর্পোরেট সেক্টr বা শিক্ষকতা জীবন থেকে অবসর নিয়ে যদি তাঁর অর্জিত অভিজ্ঞতাকে আইনের আলোয় মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করতে চান, তবে তাকে কেন সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হবে? ৩৫ বছরের এই কৃত্রিম দেয়াল মূলত বহু অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্বের আইন অঙ্গনে প্রবেশের পথ বন্ধ করে দেবে, যা বিচার ব্যবস্থার গুণগত মানকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
জনপ্রিয়তা: রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবঃ
একজন অপরাধবিজ্ঞান, সুশাসন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ হিসেবে এই অদ্ভুত ও বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক এবং সামাজিক প্রভাবকে আমি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছি। বর্তমান সরকার যখন দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও সুশাসন নিশ্চিত করতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে, তখন বার কাউন্সিলের এমন একটি অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত সরকারের ভাবমূর্তি ও জনপ্রিয়তা রক্ষা করার ক্ষেত্রে বড় ধরণের প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
দেশের লাখ লাখ শিক্ষিত যুবক ও বিভিন্ন পেশাজীবী, যারা দেরিতে হলেও আইন পেশায় আসার স্বপ্ন দেখছেন, তাদের মধ্যে এই সিদ্ধান্তের কারণে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। প্রশ্ন জাগে, এই জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো মহলের সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব বা সরকারকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করানোর কোনো প্রচ্ছন্ন নীতিনির্ধারণী বিচ্যুতি কাজ করছে কিনা? প্রশাসনের ভেতরে বা বাইরে লুকিয়ে থাকা কোনো বিশেষ গোষ্ঠী কি অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে এমন বিতর্কিত সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়ে সরকারের ওপর মানুষের আস্থা চিরতরে ক্ষুণ্ন করতে চাইছে? এই বিষয়টি রাষ্ট্র ও সরকারকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ ও গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে।
মনে রাখাতে হবে যে, আইন পেশা কোনো বয়সকাঠামোয় বন্দি করার বিষয় নয়, এটি একটি আজীবন জ্ঞানচর্চা ও মানবিক সেবার ব্রত। যেখানে বিশ্বজুড়ে সমতা, অন্তর্ভুক্তি (Inclusion) এবং মানবাধিকারের জয়গান গাওয়া হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশে এমন একটি বৈষম্যমূলক ও পশ্চাৎপদ নিয়ম কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
আমরা আশা করি, বর্তমান সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্তের গভীরের নেতিবাচক প্রভাব ও সম্ভাব্য নীতিনির্ধারণী ত্রুটির দিকটি গভীরভাবে খতিয়ে দেখবেন। দেশের সামগ্রিক আইন ব্যবস্থার মর্যাদা রক্ষা, মেধার মূল্যায়ন এবং সুশাসন নিশ্চিতকল্পে এই ৩৫ বছরের অদ্ভুত কালো নিয়ম অবিলম্বে প্রত্যাহার করাই হবে সময়ের উপযুক্ত সিদ্ধান্ত। ন্যায়বিচার যেন কোনো বয়সের ফ্রেমে আটকে না যায়, সেই পরিবেশ তৈরি করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।
লেখকঃ প্রফেসর ড. শেখ আসিফ এস. মিজান
উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া; অপরাধবিজ্ঞান, সুশাসন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ।

রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬
‘আইন’ শব্দের আদি অর্থই হলো শৃঙ্খল ও ন্যায়বিচার। সমাজের দর্পণ হিসেবে পরিচিত যে মহৎ পেশাটি মানুষের মৌলিক অধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার শেষ আশ্রয়স্থল, তা হলো আইন পেশা। সভ্যতার আদি লগ্ন থেকে আইন পেশাকে একটি স্বাধীন, মেধাভিত্তিক ও মৌলিক পেশা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। যেকোনো বয়সে আইনি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বা বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এই মহৎ পেশায় আসার অধিকারকে প্রায় সব আধুনিক রাষ্ট্রই নাগরিকের অবিচ্ছেদ্য মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এমনকি মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত সুস্থ ও সক্রিয় থেকে আইন পেশায় সংযুক্ত থাকতে কোনো বাধা নেই।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের একটি সিদ্ধান্ত দেশের আইন অঙ্গন এবং সচেতন সমাজকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। ২০২৬ সালের ৬ আগস্ট বার কাউন্সিলের ‘লিগ্যাল এডুকেশন কমিটি’ আইনজীবী তালিকাভুক্তির সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩৫ বছর নির্ধারণের একটি বিতর্কিত প্রস্তাব করে। পরবর্তীতে, ১৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখে বার কাউন্সিলের বর্তমান এডহক কমিটির (Ad-hoc Committee) একটি বিশেষ সভায় ১৫ সদস্যের কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে এই সুপারিশটি অনুমোদন করে, যা আগামী ১ জানুয়ারি ২০৩০ থেকে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। বিশ্ব বাস্তবতার সাথে সম্পূর্ণ সংঘাতপূর্ণ এই সিদ্ধান্তটি কেবল বৈষম্যমূলকই নয়, বরং এর পেছনে গভীর নীতিনির্ধারণী অদূরদর্শিতা রয়েছে কিনা—তা আজ বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বৈশ্বিক নজির ও ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিলঃ
বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রসমূহ কিংবা আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, আইনজীবী হিসেবে নিবন্ধিত বা তালিকাভুক্ত (Bar Enrollment) হওয়ার জন্য কোনো সর্বোচ্চ বয়সসীমা নেই।
১. ভারত: ১৯৯৪ সালে বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া (BCI) আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির জন্য সর্বোচ্চ ৪৫ বছর বয়সসীমা নির্ধারণের একটি নিয়ম (Rule 9) চালু করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ১৯৯৫ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট Indian Council of Legal Aid and Advice v. Bar Council of India ঐতিহাসিক মামলায় এই নিয়মটিকে সম্পূর্ণ বেআইনি, অযৌক্তিক এবং ভারতীয় সংবিধানের পরিপন্থী ঘোষণা করে বাতিল করে দেয়। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল, অবসরের পরও যে কেউ চাইলে মেধা ও যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে আইন পেশায় আসতে পারেন; বয়স কখনো মেধার পরিমাপক হতে পারে না।
২. পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা: পাকিস্তানের সংবিধানের ১৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের যেকোনো বৈধ পেশা বেছে নেওয়ার মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত। পাকিস্তান বার কাউন্সিল (PBC) কর্তৃক নির্ধারিত নিয়ম অনুসারে, যে কেউ ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা (LL.B.) অর্জন করে বার পরীক্ষায় পাস করার মাধ্যমে যেকোনো বয়সে আইনজীবী হতে পারেন। শ্রীলঙ্কার আইন অনুযায়ীও আইনজীবী (Attorney-at-Law) হিসেবে তালিকাভুক্তির কোনো বয়সসীমা রাখা হয়নি।
৩. আমেরিকা ও যুক্তরাজ্য: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আইনজীবী (Attorney) হিসেবে প্র্যাকটিস করার জন্য কোনো সর্বোচ্চ বয়সসীমা নেই। যেকোনো বয়সে ল স্কুল অ্যাডমিশন টেস্ট (LSAT) দিয়ে আইন স্কুলে ভর্তি হওয়া যায় এবং বার পরীক্ষায় বসা যায়। যুক্তরাজ্যে (ইংল্যান্ড ও ওয়েলস) ব্যারিস্টার বা সলিসিটর হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার ক্ষেত্রে বয়স কোনো বাধা নয়। মধ্য-বয়সে বা সরকারি-বেসরকারি চাকরি জীবনের শেষ ভাগে এসে আইন পেশায় ক্যারিয়ার পরিবর্তন করার ঘটনা সেখানে অত্যন্ত স্বাভাবিক ও প্রশংসিত।
৪. ইউরোপের দেশসমূহ: ফ্রান্স, জার্মানি বা ইতালির মতো ইউরোপীয় দেশগুলোতে আইনজীবী হিসেবে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে কোনো সর্বোচ্চ বয়সসীমা নেই। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) মানবাধিকার ও বৈষম্যবিরোধী আইন অনুযায়ী বয়স বা লিঙ্গের ভিত্তিতে কারও পেশা নির্বাচনের অধিকারকে খর্ব করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
আইনি এখতিয়ার ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণঃ
আইনজীবী ও দার্শনিক সিসিরো (Cicero) বলেছিলেন, "The good of the people is the chief law" অর্থাৎ জনগণের কল্যাণই হলো প্রধান আইন। বার কাউন্সিল কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্তের পেছনে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি মামলার (Civil Petition for Leave to Appeal No. 253/2014) পর্যবেক্ষণকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করলেও, আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এই সিদ্ধান্তের এখতিয়ার নিয়েই বড় প্রশ্ন রয়েছে।
'The Bangladesh Legal Practitioners and Bar Council Order, 1972'—এর ২৭(১)(বি) অনুচ্ছেদ [Article 27(1)(b)] অনুযায়ী, আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির জন্য শুধুমাত্র ন্যূনতম বয়স ২১ বছর নির্ধারণ করা আছে। মূল আইনে সর্বোচ্চ কোনো বয়সসীমার উল্লেখই নেই। আইনশাস্ত্রের সর্বজনীন নীতি হলো, মূল আইন (Parent Act) যেখানে কোনো সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ করেনি, সেখানে কোনো নিয়ামক সংস্থা তার অধীনস্থ বিধিমালা (Rules) তৈরি করে মূল আইনের পরিপন্থী কোনো সীমাবদ্ধতা বা 'সর্বোচ্চ বয়সসীমা' চাপিয়ে দিতে পারে না। এটি স্পষ্টত Ultra Vires বা আইনি এখতিয়ার বহির্ভূত একটি পদক্ষেপ। আইন পেশা কোনো সাধারণ সরকারি চাকরি নয় যে এখানে বয়সের অজুহাতে মেধাবীদের পথ রুদ্ধ করা যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত বিচারপতি ফেলিক্স ফ্রাঙ্কফুর্টার (Felix Frankfurter) পঞ্চাশ বছর বয়সে পৌঁছানোর পর তাঁর বিচারিক জীবনে যে প্রজ্ঞা দেখিয়েছেন, তা বিশ্বখ্যাত। তিনি বিশ্বাস করতেন, জীবনের অভিজ্ঞতা আইনি ব্যাখ্যাকে সমৃদ্ধ করে। একজন ব্যক্তি সামরিক বাহিনী, আমলাতন্ত্র, ব্যাংক, কর্পোরেট সেক্টr বা শিক্ষকতা জীবন থেকে অবসর নিয়ে যদি তাঁর অর্জিত অভিজ্ঞতাকে আইনের আলোয় মানুষের কল্যাণে উৎসর্গ করতে চান, তবে তাকে কেন সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হবে? ৩৫ বছরের এই কৃত্রিম দেয়াল মূলত বহু অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্বের আইন অঙ্গনে প্রবেশের পথ বন্ধ করে দেবে, যা বিচার ব্যবস্থার গুণগত মানকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
জনপ্রিয়তা: রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবঃ
একজন অপরাধবিজ্ঞান, সুশাসন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ হিসেবে এই অদ্ভুত ও বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক এবং সামাজিক প্রভাবকে আমি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছি। বর্তমান সরকার যখন দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও সুশাসন নিশ্চিত করতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে, তখন বার কাউন্সিলের এমন একটি অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত সরকারের ভাবমূর্তি ও জনপ্রিয়তা রক্ষা করার ক্ষেত্রে বড় ধরণের প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
দেশের লাখ লাখ শিক্ষিত যুবক ও বিভিন্ন পেশাজীবী, যারা দেরিতে হলেও আইন পেশায় আসার স্বপ্ন দেখছেন, তাদের মধ্যে এই সিদ্ধান্তের কারণে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। প্রশ্ন জাগে, এই জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্তের পেছনে কোনো মহলের সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব বা সরকারকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করানোর কোনো প্রচ্ছন্ন নীতিনির্ধারণী বিচ্যুতি কাজ করছে কিনা? প্রশাসনের ভেতরে বা বাইরে লুকিয়ে থাকা কোনো বিশেষ গোষ্ঠী কি অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে এমন বিতর্কিত সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়ে সরকারের ওপর মানুষের আস্থা চিরতরে ক্ষুণ্ন করতে চাইছে? এই বিষয়টি রাষ্ট্র ও সরকারকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ ও গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে।
মনে রাখাতে হবে যে, আইন পেশা কোনো বয়সকাঠামোয় বন্দি করার বিষয় নয়, এটি একটি আজীবন জ্ঞানচর্চা ও মানবিক সেবার ব্রত। যেখানে বিশ্বজুড়ে সমতা, অন্তর্ভুক্তি (Inclusion) এবং মানবাধিকারের জয়গান গাওয়া হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশে এমন একটি বৈষম্যমূলক ও পশ্চাৎপদ নিয়ম কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
আমরা আশা করি, বর্তমান সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই সিদ্ধান্তের গভীরের নেতিবাচক প্রভাব ও সম্ভাব্য নীতিনির্ধারণী ত্রুটির দিকটি গভীরভাবে খতিয়ে দেখবেন। দেশের সামগ্রিক আইন ব্যবস্থার মর্যাদা রক্ষা, মেধার মূল্যায়ন এবং সুশাসন নিশ্চিতকল্পে এই ৩৫ বছরের অদ্ভুত কালো নিয়ম অবিলম্বে প্রত্যাহার করাই হবে সময়ের উপযুক্ত সিদ্ধান্ত। ন্যায়বিচার যেন কোনো বয়সের ফ্রেমে আটকে না যায়, সেই পরিবেশ তৈরি করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।
লেখকঃ প্রফেসর ড. শেখ আসিফ এস. মিজান
উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া; অপরাধবিজ্ঞান, সুশাসন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ।

মতামত