দৈনিক পরিবর্তন সংবাদ

তিন প্রণালী : বিশ্ব বানিজ্যের নেপথ্যে নিয়ন্ত্রক (সুয়েজ খাল,হরমুজ প্রণালী, বাব আল মান্দেব)

তিন প্রণালী : বিশ্ব বানিজ্যের নেপথ্যে নিয়ন্ত্রক (সুয়েজ খাল,হরমুজ প্রণালী, বাব আল মান্দেব)

বৈশ্বিক অর্থনীতির গতি প্রকৃতিতে নিয়ন্ত্রণের আরেক নাম প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট এক একটি প্রণালী যা বিশ্ব বাণিজ্যের একমাত্র ধারক ও বাহকে পরিণত হয়ে উঠেছে। একবিংশ শতাব্দীর দ্বিমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও লড়াই, ঘনঘন যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি, কূটনৈতিক তৎপরতা ও কৌশলগত সমীকরণের মূলে রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রণালী।

 বর্তমান বিশ্বে চলমান অস্থিরতা এই জলপথগুলোর গুরুত্বকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। এগুলো শুধুমাত্র একটি জলপথই নয়, বরং নৌবাণিজ্য , জ্বালানি সরবরাহ ও পণ্য পরিবহনের একমাত্র প্রবেশদ্বার। টেকটনিক প্লেটের গতিবিধিতে পরিবর্তন, বরফের গলন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হয়েছে এই সরু জলপথগুলি। বিস্তৃত জলরাশির মধ্যে অবস্থিত সংকীর্ণ জলপথগুলি সাধারণত মহাসাগর, সাগর ও উপসাগরকে সংযুক্ত করে বিপরীতে দেশ বা মহাদেশে পৃথক করে। স্থলপথ কিংবা আকাশপথের তুলনায় সমুদ্রপথে বানিজ্যে অতি দ্রুত ও স্বল্প ব্যয়ে করা যায়। 

এজন্য বিশ্বের প্রধান প্রধান পোর্ট বা সমুদ্রবন্দরগুলি সামুদ্রিক এলাকায় গড়ে উঠেছে।তাই সম্ভব হচ্ছে নির্বিঘ্নে পণ্য সেবা ভোক্তার কাছে বিতরণ ও হস্তান্তর। বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ সমুদ্রপথে হয়ে থাকে। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত পানিপথ হলো হরমুজ প্রণালী।এটি এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ হলো কৌশলগত ভৌগলিক অবস্থান ও একমাত্র অয়েল চোকপয়েন্ট বা জ্বালানি পরিবহনের প্রবেশদ্বার। সমগ্র বিশ্বের প্রধান বাণিজ্যিক রূট বলা যায়। প্রণালীটি একদিকে পারস্য উপসাগর, আরব সাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করে বিপরীতে উত্তর প্রান্তে ইরান এবং দক্ষিণ দিকে ওমানের মুসানদাম প্রদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে পৃথক করেছে। মানচিত্রে ১৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সরু জলপথটি শুধুমাত্র একটি পথই নয়, বাস্তবে বিশ্বের অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভুরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। জলপথটির আশপাশে ঘিরে রয়েছে জ্বালানি তেল গ্যাস ও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধশালী ইরান, ইরাক, ওমান, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনের মত দেশগুলি। এসব দেশগুলো তেল, গ্যাস রপ্তানি ও শতভাগ বানিজ্যিক লেনদেন করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, যেখানে হরমুজ প্রণালী একমাত্র যাতায়াত ব্যবস্থা। এটির গভীরতা ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বড় বড় তেলবাহী জাহাজ ও সুপার ট্যাংকারগুলোর চলাচল সহজ করে দিয়েছে। প্রণালীর প্রত্যেকটি তিন কিলোমিটার চওড়া দুটি শিপিং লেন দিয়ে বানিজ্যিক জাহাজ গুলি প্রতিদিন মোট সরবরাহ তেলের এক পঞ্চমাংশ অর্থাং প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল, বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত গ্যাস(LNG) ও ইউরিয়া- আমোনিয়ার মতো রাসায়নিক সার ইউরোপ,এশিয়া ও আফ্রিকা সহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবাহিত হয়। জলপথটি দিয়ে মাএ ১০ মিনিটেই একটি তেলবাহী ট্যাংকার বের হয়ে আসার সক্ষমতা রয়েছে। এই পথটি নিয়ন্ত্রণ করছে সমগ্র বিশ্বের তিন ভাগের এক ভাগ খনিজ ও ২০ শতাংশ তেল যার বাজারমূল্যে ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, বছরে প্রায় ৫৮০ বিলিয়ন ডলার।জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থ(UNCTAD) মতে,২০২৬ এর সেপ্টেম্বর মাসেই অপরিশোধিত তেলের রপ্তানি বেড়ে দৈনিক প্রায় এক কোটি ৬৫ লাখ পৌঁছেছে এবং ২০ দশমিক ১ থেকে ২০ দশমিক ৯ মিলিয়ন পণ্য পরিবাহিত হয়েছে। এখানে অধিকাংশ বাণিজ্যিক এলাকা ইরানের অন্তর্ভুক্ত থাকায় দেশটি সবচেয়ে বেশি রপ্তানি করছে প্রায় ৯০ শতাংশ। পারস্য উপসাগরীয় এ অঞ্চলে প্রস্থান ও গমনে বিকল্প শিপিং রুট না থাকায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে একই পথ ব্যবহার করতে হয়। সেক্ষেত্রে, ব্যাবসায়ীদের নিকট অধিক উপযোগী একটি পথ। অন্যদিকে ভারত মহাসাগরের অংশীভূত লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে সংযোগকারী একটি ব্যস্ততম বাণিজ্যিক রুট বাব আল মান্দেব প্রণালী। ভৌগোলিকভাবে উত্তর পূর্ব দিকে ইয়েমেন এবং দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে জিবুতি ও ইরিত্রিয়ার মাঝে অবস্থিত।একবিংশ শতাব্দীতে হরমুজ প্রণালীর পর বিশ্বের তৃতীয় ব্যস্ততম শিপিং রুট হিসেবে ধরা হয়। বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ১০ শতাংশ এ অঞ্চল দিয়ে হয়ে থাকে। এই রুট দিয়ে প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ও প্রায় ৬০ থেকে ৫০ টি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করে।বৈশ্বিক কন্টেইনার বাণিজ্যের প্রায় এক চতুর্থাংশ এ পথ দিয়ে সম্পন্ন হয়। এছাড়া জ্বালানি পরিবহনের বাইরেও কাঁচামালের মত বাল্ক পণ্য এবং এশীয় ও ইউরোপীয় পণ্য পরিবহন করা হয় । অন্যদিকে এশিয়া ও ইউরোপের সংযোগকারী বাণিজ্যিক খাল সুয়েজ খাল। সিনাই উপদ্বীপের পশ্চিমে অবস্থিত খালটি ভূমধ্যসাগরকে লোহিত সাগরের সাথে সংযুক্ত করেছে এবং আফ্রিকা ও এশিয়া কে বিভক্ত করে।খালটির অন্যতম বিশেষত্ব এটির মধ্য দিয়ে কন্টেইনার ও রোল -অন যান চলাচল বৃদ্ধি পাওয়ায় অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য, কয়লা আকরিক ও প্রক্রিয়াজাত ধাতু, সিমেন্ট, সার, তেল ও গ্যাস আমদানি-রপ্তানি অতি দ্রুত করা যায়। বিশ্ব বাণিজ্যের ১২ শতাংশ সম্পন্ন এবং প্রতিদিন ৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার পণ্য আমদানি - রপ্তানি হয়। চলতি বছর,এ অঞ্চল দিয়ে তেল পরিবহনের পরিমাণ ৪ দশমিক ৯ থেকে ৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। ১৮৬৯ সালে খালটি উন্মুক্তকরণ ও ১৯৫৬ সালে জামাল নাসের কর্তৃক জাতীয়করণ করলে প্রায় ৭ হাজার কিলোমিটার দূরত্ব কমে ইউরোপ থেকে আরব সাগরে ও ভারত মহাসাগর হয়ে সরাসরি সাথে জুড়ে দিয়েছে। যেখানে বিকল্প পথ হিসেবে একই গতিতে কোন জাহাজ কে পার হতে হলে আফ্রিকার দক্ষিণাংশের উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে ঘুরে প্রায় চার হাজার নটিক্যাল মাইল পথ পাড়ি দিতে হবে অর্থাৎ ৯ দিনের বেশি সময় লাগতে পারে। সেক্ষেত্রে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সময় ও খরচ উভয়ই বৃদ্ধি পাবে। তাই রুটটি যেন বাণিজ্যকে সহজ করে দিয়েছে। প্রণালীগুলো বিশ্ববাণিজ্যেকে নিয়ন্ত্রণ করছে ঠিকই তবে কিছু কিছু সীমাবদ্ধতা এড়ানো যায় না। প্রথমত , এই তিন প্রণালী একটি অপরটির সাথে বিশেষভাবে সংযুক্ত। তাই এই অঞ্চলের কোন একটি রুটে সাময়িক উত্তেজনা বা ব্লকেড সৃষ্টি হলে প্রভাব পড়বে বিশ্ব বাণিজ্যের উপর এমন কি অর্থনৈতিক অবস্থা নড়বড়ে করে দিতে পারে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়ে নির্ধারিত মাএা ছাড়িয়ে ১০০ থেকে ১২০ ডলারের মধ্যে অবস্থান করতে পারে। রপ্তানি কমে জ্বালানি সংকট বাড়বে। অর্থনৈতিক মন্দা, শেয়ার বাজারে ধ্বস, জ্বালানি প্রবাহে নিয়ন্ত্রণ বিস্তার ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা, বাণিজ্যিক জাহাজগুলিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও হামলার আশঙ্কা, বাণিজ্য অনিশ্চয়তা।দ্বিতীয়ত, এই পথগুলো সমুদ্র রাজনীতি ও বিশ্বরাজনীতির অংশ হয়ে উঠছে দিন দিন । প্রণালী এলাকায় সামরিক ঘাঁটি স্থাপন, কৌশলগত তেল পাইপলাইন , গোপন সাবমেরিন ও নজরদারি, জলদস্যুদের তৎপরতা ও সামুদ্রিক হামলা। তৃতীয়ত, প্রণালী গুলোকে ঘিরে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে শুরু হয়েছে অর্থনৈতিক স্বার্থ ও প্রতিযোগিতা, কৌশলগত সমীকরণ এ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। শুরু হয়েছে ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন,যুদ্ধের উত্তেজনা ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত ,পরিণত ছচ্ছে সামরিক কৌশলের খেলায়। এতে বোঝা যায়, যারা বিশ্বের প্রধান সমুদ্র উপকূল ও প্রণালীগুলো নিয়ন্ত্রণ করবে তারাই বিশ্ব রাজনীতি ও বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ করবে। সেখানে বিশ্ববাণিজ্যকে কেন্দ্র করে জলপথগুলি এক একটি হাতিয়ার মাত্র। যার স্পষ্ট প্রমাণ ইরানের হরমুজ প্রণালীকে ট্রামকার্ড হিসেবে ব্যবহার ও তা বন্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা বা মার্কিনের এ অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা। অন্যদিকে সম্প্রতি ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের বাব এল মান্দেব দখল নতুন ইঙ্গিত দেয়। ফলে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। সর্বোপরি বলা যায় যে, প্রণালীর বুকে চলমান এক একটি জাহাজ বহন করে অর্থনৈতিক গতিশীলতা, তৈরি করে বিশ্ববাজারের নতুন সমীকরণ। সেখানে রাজনীতি ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু করা মানে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ভাঙ্গনের নামান্তর।  

 তাই,বিশ্ববাজারে অভিঘাত নিরসনে প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বহুমুখী উদ্যোগ , সমুদ্র আইন শক্তিশালীকরণ ও তা বাস্তবায়ন, নৌ চলাচল নিরাপদ করা ও স্বাধীনতা সমুন্নত রাখা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি , বহুমুখী সরবরাহব্যবস্থা ও জ্বালানি মজুদ এবং নাশকতা ও সংঘাত প্রতিরোধ। প্রয়োজন প্রতিযোগিতা ভুলে বিশ্ব অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। এতে বিশ্ববাণিজ্য স্থিতিশীলই হবে না, বরং গড়ে উঠবে একটি শক্তিশালী ও শান্তিপূর্ন বিশ্বব্যবস্থা।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

তিন প্রণালী : বিশ্ব বানিজ্যের নেপথ্যে নিয়ন্ত্রক (সুয়েজ খাল,হরমুজ প্রণালী, বাব আল মান্দেব)
0:00 0:00
1.0x
দৈনিক পরিবর্তন সংবাদ

শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬


তিন প্রণালী : বিশ্ব বানিজ্যের নেপথ্যে নিয়ন্ত্রক (সুয়েজ খাল,হরমুজ প্রণালী, বাব আল মান্দেব)

প্রকাশের তারিখ : ১৬ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

বৈশ্বিক অর্থনীতির গতি প্রকৃতিতে নিয়ন্ত্রণের আরেক নাম প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট এক একটি প্রণালী যা বিশ্ব বাণিজ্যের একমাত্র ধারক ও বাহকে পরিণত হয়ে উঠেছে। একবিংশ শতাব্দীর দ্বিমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও লড়াই, ঘনঘন যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি, কূটনৈতিক তৎপরতা ও কৌশলগত সমীকরণের মূলে রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রণালী।

 বর্তমান বিশ্বে চলমান অস্থিরতা এই জলপথগুলোর গুরুত্বকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। এগুলো শুধুমাত্র একটি জলপথই নয়, বরং নৌবাণিজ্য , জ্বালানি সরবরাহ ও পণ্য পরিবহনের একমাত্র প্রবেশদ্বার। টেকটনিক প্লেটের গতিবিধিতে পরিবর্তন, বরফের গলন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হয়েছে এই সরু জলপথগুলি। বিস্তৃত জলরাশির মধ্যে অবস্থিত সংকীর্ণ জলপথগুলি সাধারণত মহাসাগর, সাগর ও উপসাগরকে সংযুক্ত করে বিপরীতে দেশ বা মহাদেশে পৃথক করে। স্থলপথ কিংবা আকাশপথের তুলনায় সমুদ্রপথে বানিজ্যে অতি দ্রুত ও স্বল্প ব্যয়ে করা যায়। 

এজন্য বিশ্বের প্রধান প্রধান পোর্ট বা সমুদ্রবন্দরগুলি সামুদ্রিক এলাকায় গড়ে উঠেছে।তাই সম্ভব হচ্ছে নির্বিঘ্নে পণ্য সেবা ভোক্তার কাছে বিতরণ ও হস্তান্তর। বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ৮০ শতাংশ সমুদ্রপথে হয়ে থাকে। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত পানিপথ হলো হরমুজ প্রণালী।এটি এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ হলো কৌশলগত ভৌগলিক অবস্থান ও একমাত্র অয়েল চোকপয়েন্ট বা জ্বালানি পরিবহনের প্রবেশদ্বার। সমগ্র বিশ্বের প্রধান বাণিজ্যিক রূট বলা যায়। প্রণালীটি একদিকে পারস্য উপসাগর, আরব সাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করে বিপরীতে উত্তর প্রান্তে ইরান এবং দক্ষিণ দিকে ওমানের মুসানদাম প্রদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে পৃথক করেছে। মানচিত্রে ১৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সরু জলপথটি শুধুমাত্র একটি পথই নয়, বাস্তবে বিশ্বের অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও ভুরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। জলপথটির আশপাশে ঘিরে রয়েছে জ্বালানি তেল গ্যাস ও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধশালী ইরান, ইরাক, ওমান, কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনের মত দেশগুলি। এসব দেশগুলো তেল, গ্যাস রপ্তানি ও শতভাগ বানিজ্যিক লেনদেন করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, যেখানে হরমুজ প্রণালী একমাত্র যাতায়াত ব্যবস্থা। এটির গভীরতা ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বড় বড় তেলবাহী জাহাজ ও সুপার ট্যাংকারগুলোর চলাচল সহজ করে দিয়েছে। প্রণালীর প্রত্যেকটি তিন কিলোমিটার চওড়া দুটি শিপিং লেন দিয়ে বানিজ্যিক জাহাজ গুলি প্রতিদিন মোট সরবরাহ তেলের এক পঞ্চমাংশ অর্থাং প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল, বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত গ্যাস(LNG) ও ইউরিয়া- আমোনিয়ার মতো রাসায়নিক সার ইউরোপ,এশিয়া ও আফ্রিকা সহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবাহিত হয়। জলপথটি দিয়ে মাএ ১০ মিনিটেই একটি তেলবাহী ট্যাংকার বের হয়ে আসার সক্ষমতা রয়েছে। এই পথটি নিয়ন্ত্রণ করছে সমগ্র বিশ্বের তিন ভাগের এক ভাগ খনিজ ও ২০ শতাংশ তেল যার বাজারমূল্যে ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, বছরে প্রায় ৫৮০ বিলিয়ন ডলার।জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থ(UNCTAD) মতে,২০২৬ এর সেপ্টেম্বর মাসেই অপরিশোধিত তেলের রপ্তানি বেড়ে দৈনিক প্রায় এক কোটি ৬৫ লাখ পৌঁছেছে এবং ২০ দশমিক ১ থেকে ২০ দশমিক ৯ মিলিয়ন পণ্য পরিবাহিত হয়েছে। এখানে অধিকাংশ বাণিজ্যিক এলাকা ইরানের অন্তর্ভুক্ত থাকায় দেশটি সবচেয়ে বেশি রপ্তানি করছে প্রায় ৯০ শতাংশ। পারস্য উপসাগরীয় এ অঞ্চলে প্রস্থান ও গমনে বিকল্প শিপিং রুট না থাকায় বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে একই পথ ব্যবহার করতে হয়। সেক্ষেত্রে, ব্যাবসায়ীদের নিকট অধিক উপযোগী একটি পথ। অন্যদিকে ভারত মহাসাগরের অংশীভূত লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে সংযোগকারী একটি ব্যস্ততম বাণিজ্যিক রুট বাব আল মান্দেব প্রণালী। ভৌগোলিকভাবে উত্তর পূর্ব দিকে ইয়েমেন এবং দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলে জিবুতি ও ইরিত্রিয়ার মাঝে অবস্থিত।একবিংশ শতাব্দীতে হরমুজ প্রণালীর পর বিশ্বের তৃতীয় ব্যস্ততম শিপিং রুট হিসেবে ধরা হয়। বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ১০ শতাংশ এ অঞ্চল দিয়ে হয়ে থাকে। এই রুট দিয়ে প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ও প্রায় ৬০ থেকে ৫০ টি পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করে।বৈশ্বিক কন্টেইনার বাণিজ্যের প্রায় এক চতুর্থাংশ এ পথ দিয়ে সম্পন্ন হয়। এছাড়া জ্বালানি পরিবহনের বাইরেও কাঁচামালের মত বাল্ক পণ্য এবং এশীয় ও ইউরোপীয় পণ্য পরিবহন করা হয় । অন্যদিকে এশিয়া ও ইউরোপের সংযোগকারী বাণিজ্যিক খাল সুয়েজ খাল। সিনাই উপদ্বীপের পশ্চিমে অবস্থিত খালটি ভূমধ্যসাগরকে লোহিত সাগরের সাথে সংযুক্ত করেছে এবং আফ্রিকা ও এশিয়া কে বিভক্ত করে।খালটির অন্যতম বিশেষত্ব এটির মধ্য দিয়ে কন্টেইনার ও রোল -অন যান চলাচল বৃদ্ধি পাওয়ায় অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য, কয়লা আকরিক ও প্রক্রিয়াজাত ধাতু, সিমেন্ট, সার, তেল ও গ্যাস আমদানি-রপ্তানি অতি দ্রুত করা যায়। বিশ্ব বাণিজ্যের ১২ শতাংশ সম্পন্ন এবং প্রতিদিন ৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার পণ্য আমদানি - রপ্তানি হয়। চলতি বছর,এ অঞ্চল দিয়ে তেল পরিবহনের পরিমাণ ৪ দশমিক ৯ থেকে ৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। ১৮৬৯ সালে খালটি উন্মুক্তকরণ ও ১৯৫৬ সালে জামাল নাসের কর্তৃক জাতীয়করণ করলে প্রায় ৭ হাজার কিলোমিটার দূরত্ব কমে ইউরোপ থেকে আরব সাগরে ও ভারত মহাসাগর হয়ে সরাসরি সাথে জুড়ে দিয়েছে। যেখানে বিকল্প পথ হিসেবে একই গতিতে কোন জাহাজ কে পার হতে হলে আফ্রিকার দক্ষিণাংশের উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে ঘুরে প্রায় চার হাজার নটিক্যাল মাইল পথ পাড়ি দিতে হবে অর্থাৎ ৯ দিনের বেশি সময় লাগতে পারে। সেক্ষেত্রে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সময় ও খরচ উভয়ই বৃদ্ধি পাবে। তাই রুটটি যেন বাণিজ্যকে সহজ করে দিয়েছে। প্রণালীগুলো বিশ্ববাণিজ্যেকে নিয়ন্ত্রণ করছে ঠিকই তবে কিছু কিছু সীমাবদ্ধতা এড়ানো যায় না। প্রথমত , এই তিন প্রণালী একটি অপরটির সাথে বিশেষভাবে সংযুক্ত। তাই এই অঞ্চলের কোন একটি রুটে সাময়িক উত্তেজনা বা ব্লকেড সৃষ্টি হলে প্রভাব পড়বে বিশ্ব বাণিজ্যের উপর এমন কি অর্থনৈতিক অবস্থা নড়বড়ে করে দিতে পারে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়ে নির্ধারিত মাএা ছাড়িয়ে ১০০ থেকে ১২০ ডলারের মধ্যে অবস্থান করতে পারে। রপ্তানি কমে জ্বালানি সংকট বাড়বে। অর্থনৈতিক মন্দা, শেয়ার বাজারে ধ্বস, জ্বালানি প্রবাহে নিয়ন্ত্রণ বিস্তার ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা, বাণিজ্যিক জাহাজগুলিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও হামলার আশঙ্কা, বাণিজ্য অনিশ্চয়তা।দ্বিতীয়ত, এই পথগুলো সমুদ্র রাজনীতি ও বিশ্বরাজনীতির অংশ হয়ে উঠছে দিন দিন । প্রণালী এলাকায় সামরিক ঘাঁটি স্থাপন, কৌশলগত তেল পাইপলাইন , গোপন সাবমেরিন ও নজরদারি, জলদস্যুদের তৎপরতা ও সামুদ্রিক হামলা। তৃতীয়ত, প্রণালী গুলোকে ঘিরে পরাশক্তিগুলোর মধ্যে শুরু হয়েছে অর্থনৈতিক স্বার্থ ও প্রতিযোগিতা, কৌশলগত সমীকরণ এ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। শুরু হয়েছে ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন,যুদ্ধের উত্তেজনা ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত ,পরিণত ছচ্ছে সামরিক কৌশলের খেলায়। এতে বোঝা যায়, যারা বিশ্বের প্রধান সমুদ্র উপকূল ও প্রণালীগুলো নিয়ন্ত্রণ করবে তারাই বিশ্ব রাজনীতি ও বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ করবে। সেখানে বিশ্ববাণিজ্যকে কেন্দ্র করে জলপথগুলি এক একটি হাতিয়ার মাত্র। যার স্পষ্ট প্রমাণ ইরানের হরমুজ প্রণালীকে ট্রামকার্ড হিসেবে ব্যবহার ও তা বন্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা বা মার্কিনের এ অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা। অন্যদিকে সম্প্রতি ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের বাব এল মান্দেব দখল নতুন ইঙ্গিত দেয়। ফলে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিচ্ছে। সর্বোপরি বলা যায় যে, প্রণালীর বুকে চলমান এক একটি জাহাজ বহন করে অর্থনৈতিক গতিশীলতা, তৈরি করে বিশ্ববাজারের নতুন সমীকরণ। সেখানে রাজনীতি ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু করা মানে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে ভাঙ্গনের নামান্তর।  

 তাই,বিশ্ববাজারে অভিঘাত নিরসনে প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বহুমুখী উদ্যোগ , সমুদ্র আইন শক্তিশালীকরণ ও তা বাস্তবায়ন, নৌ চলাচল নিরাপদ করা ও স্বাধীনতা সমুন্নত রাখা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি , বহুমুখী সরবরাহব্যবস্থা ও জ্বালানি মজুদ এবং নাশকতা ও সংঘাত প্রতিরোধ। প্রয়োজন প্রতিযোগিতা ভুলে বিশ্ব অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। এতে বিশ্ববাণিজ্য স্থিতিশীলই হবে না, বরং গড়ে উঠবে একটি শক্তিশালী ও শান্তিপূর্ন বিশ্বব্যবস্থা।




দৈনিক পরিবর্তন সংবাদ

উপদেষ্টা সম্পাদক: গোলাম আকবর খন্দকার (সাবেক এমপি)
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: লেঃ কর্নেল এ কে এম রশিদুন্নবী,পিএসসি ( অবঃ)
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ শাহাদাৎ হোসেন

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত