ঢাকা বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ভিন্ন আবহে শুরু হলো ভাষা আন্দোলনের মাস, নেই বইমেলার চেনা উৎসব

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১১:০২ দুপুর

ছবি: সংগৃহীত

বাঙালির আত্মপরিচয়ের মাস ফেব্রুয়ারি শুরু হলেও এবার তার আবহ একেবারেই ব্যতিক্রম। দীর্ঘদিনের রীতি ভেঙে ভাষার মাসের প্রথম দিন শুরু হয়নি বহুল প্রত্যাশিত ‘অমর একুশে বইমেলা’। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে নির্ধারিত সময়ে বইমেলা আয়োজন সম্ভব না হওয়ায় ফেব্রুয়ারির প্রথম দিনটি কাটছে বইমেলার সেই চেনা উৎসবমুখর পরিবেশ ছাড়াই।

প্রতি বছর ভাষা শহীদদের স্মরণ, শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন আর বইমেলার সম্মিলিত আমেজে ফেব্রুয়ারির সূচনা হয়। সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ভাষা চেতনার মিলনমেলায় রূপ নেয় পুরো মাস। কিন্তু এবার সেই পরিচিত দৃশ্য অনুপস্থিত থাকায় ভাষার মাসের শুরুটা অনেকটাই নিরাবেগ ও শূন্যতা অনুভব করাচ্ছে।

ফেব্রুয়ারি বাঙালির কাছে কেবল একটি ক্যালেন্ডারের মাস নয়। এটি আত্মত্যাগ, প্রতিবাদ ও ভাষাভিত্তিক অধিকার অর্জনের প্রতীক। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকার রাজপথে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিলেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অসংখ্য তরুণ। তাদের আত্মত্যাগের স্মৃতিকে ধারণ করেই পুরো মাসজুড়ে পালিত হয় ভাষা আন্দোলনভিত্তিক নানা কর্মসূচি।

ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব শুধু জাতীয় পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করার মাধ্যমে আন্দোলনটি পায় বৈশ্বিক স্বীকৃতি। এরপর থেকে বিশ্বের নানা দেশে মাতৃভাষার মর্যাদা ও ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষার প্রতীক হিসেবে দিনটি পালিত হয়ে আসছে।

ভাষা আন্দোলনের সূচনা ঘটে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরপরই। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ উর্দুকেই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন। একই বক্তব্য তিনি কার্জন হলেও পুনর্ব্যক্ত করলে উপস্থিত ছাত্রদের একাংশ প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানান। পরে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়, যা আন্দোলনের প্রথম সংগঠিত প্রকাশ।

এর আগেই ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্র ও অধ্যাপক গড়ে তোলেন ‘তমদ্দুন মজলিস’। ভাষার প্রশ্নে সভা, আলোচনা ও লেখালেখির মাধ্যমে সংগঠনটি আন্দোলনের ভিত্তি শক্ত করে। পরবর্তীতে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের মধ্য দিয়ে আন্দোলন আরও বিস্তৃত ও সংঘবদ্ধ হয়।

১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ফজলুল হক হলে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ছাত্রসংগঠনের উদ্যোগে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। সেদিনই ১১ মার্চ সারা পূর্ব বাংলায় সাধারণ ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই ধর্মঘট চলাকালে শেখ মুজিবুর রহমানসহ বহু নেতাকর্মী গ্রেফতার হলে আন্দোলন আরও তীব্র আকার ধারণ করে।

১৯৪৮ সালের শেষদিকে করাচিতে অনুষ্ঠিত নিখিল পাকিস্তান শিক্ষা সম্মেলনে বাংলা ভাষাকে আরবি হরফে লেখার প্রস্তাব এবং পরে বাংলা হরফ বাতিলের ঘোষণায় পূর্ব বাংলায় তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নামেন এবং বাংলা ভাষা ও হরফ রক্ষার আন্দোলন নতুন গতি পায়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে। কিন্তু ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ছাত্ররা মিছিল বের করলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ এলাকায় পুলিশের গুলিতে একাধিক তরুণ শহীদ হন।

এই রক্তাক্ত পথ পেরিয়েই বাঙালি অর্জন করে মাতৃভাষার অধিকার। ভাষা আন্দোলনের চেতনাই পরবর্তীতে স্বাধিকার আন্দোলন ও রাজনৈতিক সংগ্রামের ভিত্তি গড়ে দেয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়।

Link copied!