দৈনিক পরিবর্তন সংবাদ
প্রকাশ : সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬

পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ, ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন তবে শুধু পাসের হার দিয়ে শিক্ষার মান নির্ধারণ কতটা যৌক্তিক?

এইচএসসির ফল বিপর্যয়: প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় কোথায় বাংলাদেশ?

এইচএসসির ফল বিপর্যয়: প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় কোথায় বাংলাদেশ?

চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার কমে দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে। গত ২২ বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন। বিশেষ করে মানবিক বিভাগে ৫৮ শতাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। ইংরেজি ও আইসিটিতে ফেল করেছে ৩ লাখ ৮২ হাজার পরীক্ষার্থী, যা মোট অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর ৬৪ শতাংশ।

ফলাফলের এমন চিত্র দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি এবং পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের শিক্ষার অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

প্রতিবেশী ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষার ফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশভেদে পাসের হারে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। কোথাও এই হার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশের বেশি, আবার কোথাও ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের মধ্যে। যুক্তরাজ্যে এ-লেভেল পরীক্ষায় পাসের হার প্রায় ৯৮ শতাংশ।

তবে বিভিন্ন দেশের পরীক্ষাব্যবস্থা, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও উত্তীর্ণ হওয়ার শর্ত এক নয়। ফলে শুধু পাসের হার দিয়ে এসব দেশের শিক্ষার মানের সরাসরি তুলনা করা কঠিন।


ভারতে পাসের হার ৮৮ শতাংশের বেশি

ভারতের কেন্দ্রীয় মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের (সিবিএসই) দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষায় ২০২৫ সালে পাসের হার ছিল ৮৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ। দেশটির অন্যতম বড় এই শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দেয়।

একই বছর ইন্ডিয়ান সার্টিফিকেট অব সেকেন্ডারি এডুকেশন কাউন্সিলের (সিআইএসসিই) আইএসসি পরীক্ষাতেও পাসের হার ছিল কাছাকাছি।

অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গে ২০২৫ সালের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৯০ দশমিক ৭৯ শতাংশ। বাংলাদেশের চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষার তুলনায় এই হার ৩৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ বেশি।

তবে ভারতের এসব বোর্ডের ফলাফলকে দেশটির সব উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সামগ্রিক ফল হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। কারণ সেখানে কেন্দ্রীয় বোর্ডের পাশাপাশি রাজ্যভিত্তিক পৃথক শিক্ষা বোর্ড রয়েছে।


নেপালে পাসের হার ৬১ শতাংশ

নেপালের ন্যাশনাল এক্সামিনেশন বোর্ডের (এনইবি) অধীনে ২০২৫ সালের গ্রেড-১২ পরীক্ষায় পাসের হার ছিল প্রায় ৬১ দশমিক ১৭ শতাংশ। বাংলাদেশের তুলনায় দেশটির পাসের হার প্রায় ৯ শতাংশ বেশি।

তবে নেপালের পরীক্ষায় বিষয়ভিত্তিক গ্রেড, ন্যূনতম নম্বর এবং উত্তীর্ণ হওয়ার শর্ত ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই দুই দেশের ফলাফলের ব্যবধানকে সরাসরি শিক্ষার মানের ব্যবধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।


পাকিস্তানে একক জাতীয় পাসের হার নেই

পাকিস্তানে বাংলাদেশের মতো একক কেন্দ্রীয় শিক্ষা বোর্ড নেই। দেশটির বিভিন্ন প্রদেশ ও বড় শহরে পৃথক শিক্ষা বোর্ডের অধীনে উচ্চমাধ্যমিক বা ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।

বিজ্ঞান, প্রি-মেডিকেল, প্রি-ইঞ্জিনিয়ারিং, জেনারেল সায়েন্স, বাণিজ্য ও মানবিক বিভাগের ফলও আলাদাভাবে প্রকাশ করা হয়।

পাঞ্জাব প্রদেশের বিভিন্ন বোর্ডে পাসের হার ৫৫ থেকে ৭২ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করেছে। ফয়সালাবাদ বোর্ডে পাসের হার ছিল ৭১ দশমিক ১৩, রাওয়ালপিন্ডিতে ৬০ দশমিক ৮০, মুলতানে ৬৫ দশমিক ১৫, গুজরানওয়ালায় ৫৮ দশমিক ১৬ এবং লাহোরে ৬০ দশমিক ০৩ শতাংশ।

বিভাগভেদেও ফলাফলে পার্থক্য রয়েছে। প্রি-মেডিকেল বিভাগে পাসের হার ৬১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। প্রি-ইঞ্জিনিয়ারিং ও জেনারেল সায়েন্স বিভাগে এই হার ৫৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। অন্যদিকে, বাণিজ্য ও মানবিক বিভাগে অনেক ক্ষেত্রে পাসের হার ৫০ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে।

এ ছাড়া পাকিস্তানের ইন্টার বোর্ড কো-অর্ডিনেশন কমিশন (আইবিসিসি) উত্তীর্ণ হওয়ার ন্যূনতম মানদণ্ড ৩৩ থেকে বাড়িয়ে ৪০ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে দেশটির ফলাফল বিশ্লেষণে নতুন পাসের শর্তও বিবেচনায় নিতে হবে।


যুক্তরাজ্যে পাসের হার বেশি, তবে পদ্ধতি আলাদা

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের মতো সব শিক্ষার্থীর জন্য একই ধরনের কেন্দ্রীয় উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা নেই। সেখানে বিভিন্ন পরীক্ষণ সংস্থার মাধ্যমে এ-লেভেল পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়।

২০২৫ সালে যুক্তরাজ্যে এ-লেভেল পরীক্ষায় ‘এ’ থেকে ‘ই’ গ্রেড পাওয়া শিক্ষার্থীর হার ছিল প্রায় ৯৭ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে এখানে পাস বলতে ‘এ’ থেকে ‘ই’ গ্রেড পর্যন্ত ফলকে বোঝানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় গ্রেড প্রতিষ্ঠান, বিষয় ও কোর্সভেদে আলাদা।

তাই এ-লেভেলের এই পাসের হার বাংলাদেশের এইচএসসি পরীক্ষার সঙ্গে সরাসরি তুলনাযোগ্য নয়।


যুক্তরাষ্ট্রে নেই কেন্দ্রীয় পাবলিক পরীক্ষা

যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা বাংলাদেশের তুলনায় অনেকটাই আলাদা। সেখানে সারা দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে এইচএসসির মতো কোনো পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় না।

স্কুলের ধারাবাহিক মূল্যায়ন, নির্ধারিত ক্রেডিট অর্জন এবং প্রয়োজনীয় কোর্স সম্পন্ন করার ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের হাই স্কুল ডিপ্লোমা দেওয়া হয়। দেশটিতে হাই স্কুল সম্পন্ন করার হার ৮৭ শতাংশের বেশি।


শিক্ষার মান নির্ধারণে পাসের হারই শেষ কথা নয়

শিক্ষাবিদদের মতে, পরীক্ষায় কত শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করল, তা দিয়ে কোনো দেশের শিক্ষার সামগ্রিক মান নির্ধারণ করা যায় না। শিক্ষার্থীরা কতটুকু শিখছে, তাদের পাঠ, ইংরেজি ও গণিতের দক্ষতা কেমন এবং অর্জিত জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারছে কি না, সেসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হয়।

ইউনেসকোর টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) চার নম্বর লক্ষ্যে মানসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নির্ধারিত বয়সে শিশুদের পাঠ ও গণিতের ন্যূনতম দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) পিসা (পিআইএসএ) পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে বাস্তব জীবনে পড়া, গণিত ও বিজ্ঞানের জ্ঞান প্রয়োগের সক্ষমতা যাচাই করা হয়। এ পরীক্ষা মূলত ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের দক্ষতা পরিমাপ করে।

এ বিষয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক তপন কুমার সরকার বলেন, বাংলাদেশের পরীক্ষার ফলাফলে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রভাব ছিল। একসময় পাসের হার বাড়ানোর চাপ ছিল, আবার পরে পাসের হার কমানোর চাপ এসেছে।

ফলাফলের পরিসংখ্যানে পরিবর্তনের পেছনে প্রশ্নপত্রের ধরন, উত্তরপত্র মূল্যায়নের কঠোরতা বা শিথিলতা এবং গ্রেস মার্ক দেওয়ার মতো বিষয়ও ভূমিকা রেখেছে। এসব কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যান্য দেশের পরীক্ষার ফল সরাসরি তুলনা করা কঠিন।


বিদেশে উচ্চশিক্ষায় বাড়তে পারে চ্যালেঞ্জ

এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার কমে যাওয়ায় বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে আগ্রহী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে উচ্চমাধ্যমিকের ফল গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়।

তবে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাধারণত কোনো দেশের সামগ্রিক পাসের হারের ভিত্তিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করে না। তারা আবেদনকারীর ব্যক্তিগত ফলাফল, বিষয়ভিত্তিক গ্রেড, ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা, ভর্তি পরীক্ষার ফল এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমসহ বিভিন্ন যোগ্যতা বিবেচনা করে।

ফলে সামগ্রিক পাসের হার কমার চেয়ে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ফল ও বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার ঘাটতি বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।

তুলনামূলক কম ফল করা শিক্ষার্থীদের পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কিংবা বৃত্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় গ্রেড বা বিষয়ভিত্তিক নম্বর না থাকলে ফাউন্ডেশন কোর্স সম্পন্ন করার শর্তও দেওয়া হতে পারে। এতে বিদেশে উচ্চশিক্ষার সময় ও ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, কত শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করলে সেটিকে ভালো ফল বলা যাবে, এমন কোনো নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নেই। কারণ প্রতিটি দেশের শিক্ষাক্রম, পাঠদান পদ্ধতি, পরীক্ষা গ্রহণ ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের ধরন আলাদা।

বাংলাদেশের এবারের ফলাফলকে গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, পাসের হার কমে যাওয়ার পেছনে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ঘাটতি, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান, শিক্ষকদের দক্ষতা, পরীক্ষার প্রশ্নের ধরন এবং মূল্যায়ন পদ্ধতি—সবকিছুই বিবেচনায় নিতে হবে।

বিশেষ করে কোন বিষয়ে কতসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে, শহর ও গ্রামের ফলাফলে কী পার্থক্য এবং প্রতিষ্ঠানভেদে ফলের তারতম্য কতটা, সেসব তথ্য বিশ্লেষণ করা জরুরি।

পরিবর্তন সংবাদ/এসআর

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

এইচএসসির ফল বিপর্যয়: প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় কোথায় বাংলাদেশ?
0:00 0:00
1.0x
দৈনিক পরিবর্তন সংবাদ

সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬


এইচএসসির ফল বিপর্যয়: প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় কোথায় বাংলাদেশ?

প্রকাশের তারিখ : ০২ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার কমে দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে। গত ২২ বছরের মধ্যে এটি সর্বনিম্ন। বিশেষ করে মানবিক বিভাগে ৫৮ শতাংশ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। ইংরেজি ও আইসিটিতে ফেল করেছে ৩ লাখ ৮২ হাজার পরীক্ষার্থী, যা মোট অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর ৬৪ শতাংশ।


ফলাফলের এমন চিত্র দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি এবং পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের শিক্ষার অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।


প্রতিবেশী ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের পরীক্ষার ফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশভেদে পাসের হারে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। কোথাও এই হার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশের বেশি, আবার কোথাও ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের মধ্যে। যুক্তরাজ্যে এ-লেভেল পরীক্ষায় পাসের হার প্রায় ৯৮ শতাংশ।


তবে বিভিন্ন দেশের পরীক্ষাব্যবস্থা, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও উত্তীর্ণ হওয়ার শর্ত এক নয়। ফলে শুধু পাসের হার দিয়ে এসব দেশের শিক্ষার মানের সরাসরি তুলনা করা কঠিন।


ভারতে পাসের হার ৮৮ শতাংশের বেশি

ভারতের কেন্দ্রীয় মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের (সিবিএসই) দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষায় ২০২৫ সালে পাসের হার ছিল ৮৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ। দেশটির অন্যতম বড় এই শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দেয়।


একই বছর ইন্ডিয়ান সার্টিফিকেট অব সেকেন্ডারি এডুকেশন কাউন্সিলের (সিআইএসসিই) আইএসসি পরীক্ষাতেও পাসের হার ছিল কাছাকাছি।


অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গে ২০২৫ সালের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৯০ দশমিক ৭৯ শতাংশ। বাংলাদেশের চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষার তুলনায় এই হার ৩৮ দশমিক ৬৭ শতাংশ বেশি।


তবে ভারতের এসব বোর্ডের ফলাফলকে দেশটির সব উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সামগ্রিক ফল হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। কারণ সেখানে কেন্দ্রীয় বোর্ডের পাশাপাশি রাজ্যভিত্তিক পৃথক শিক্ষা বোর্ড রয়েছে।


নেপালে পাসের হার ৬১ শতাংশ

নেপালের ন্যাশনাল এক্সামিনেশন বোর্ডের (এনইবি) অধীনে ২০২৫ সালের গ্রেড-১২ পরীক্ষায় পাসের হার ছিল প্রায় ৬১ দশমিক ১৭ শতাংশ। বাংলাদেশের তুলনায় দেশটির পাসের হার প্রায় ৯ শতাংশ বেশি।


তবে নেপালের পরীক্ষায় বিষয়ভিত্তিক গ্রেড, ন্যূনতম নম্বর এবং উত্তীর্ণ হওয়ার শর্ত ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই দুই দেশের ফলাফলের ব্যবধানকে সরাসরি শিক্ষার মানের ব্যবধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।


পাকিস্তানে একক জাতীয় পাসের হার নেই

পাকিস্তানে বাংলাদেশের মতো একক কেন্দ্রীয় শিক্ষা বোর্ড নেই। দেশটির বিভিন্ন প্রদেশ ও বড় শহরে পৃথক শিক্ষা বোর্ডের অধীনে উচ্চমাধ্যমিক বা ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়।


বিজ্ঞান, প্রি-মেডিকেল, প্রি-ইঞ্জিনিয়ারিং, জেনারেল সায়েন্স, বাণিজ্য ও মানবিক বিভাগের ফলও আলাদাভাবে প্রকাশ করা হয়।


পাঞ্জাব প্রদেশের বিভিন্ন বোর্ডে পাসের হার ৫৫ থেকে ৭২ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করেছে। ফয়সালাবাদ বোর্ডে পাসের হার ছিল ৭১ দশমিক ১৩, রাওয়ালপিন্ডিতে ৬০ দশমিক ৮০, মুলতানে ৬৫ দশমিক ১৫, গুজরানওয়ালায় ৫৮ দশমিক ১৬ এবং লাহোরে ৬০ দশমিক ০৩ শতাংশ।


বিভাগভেদেও ফলাফলে পার্থক্য রয়েছে। প্রি-মেডিকেল বিভাগে পাসের হার ৬১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। প্রি-ইঞ্জিনিয়ারিং ও জেনারেল সায়েন্স বিভাগে এই হার ৫৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। অন্যদিকে, বাণিজ্য ও মানবিক বিভাগে অনেক ক্ষেত্রে পাসের হার ৫০ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে।


এ ছাড়া পাকিস্তানের ইন্টার বোর্ড কো-অর্ডিনেশন কমিশন (আইবিসিসি) উত্তীর্ণ হওয়ার ন্যূনতম মানদণ্ড ৩৩ থেকে বাড়িয়ে ৪০ শতাংশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে দেশটির ফলাফল বিশ্লেষণে নতুন পাসের শর্তও বিবেচনায় নিতে হবে।


যুক্তরাজ্যে পাসের হার বেশি, তবে পদ্ধতি আলাদা

যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের মতো সব শিক্ষার্থীর জন্য একই ধরনের কেন্দ্রীয় উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা নেই। সেখানে বিভিন্ন পরীক্ষণ সংস্থার মাধ্যমে এ-লেভেল পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়।


২০২৫ সালে যুক্তরাজ্যে এ-লেভেল পরীক্ষায় ‘এ’ থেকে ‘ই’ গ্রেড পাওয়া শিক্ষার্থীর হার ছিল প্রায় ৯৭ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে এখানে পাস বলতে ‘এ’ থেকে ‘ই’ গ্রেড পর্যন্ত ফলকে বোঝানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় গ্রেড প্রতিষ্ঠান, বিষয় ও কোর্সভেদে আলাদা।


তাই এ-লেভেলের এই পাসের হার বাংলাদেশের এইচএসসি পরীক্ষার সঙ্গে সরাসরি তুলনাযোগ্য নয়।


যুক্তরাষ্ট্রে নেই কেন্দ্রীয় পাবলিক পরীক্ষা

যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা বাংলাদেশের তুলনায় অনেকটাই আলাদা। সেখানে সারা দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে এইচএসসির মতো কোনো পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় না।


স্কুলের ধারাবাহিক মূল্যায়ন, নির্ধারিত ক্রেডিট অর্জন এবং প্রয়োজনীয় কোর্স সম্পন্ন করার ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের হাই স্কুল ডিপ্লোমা দেওয়া হয়। দেশটিতে হাই স্কুল সম্পন্ন করার হার ৮৭ শতাংশের বেশি।


শিক্ষার মান নির্ধারণে পাসের হারই শেষ কথা নয়

শিক্ষাবিদদের মতে, পরীক্ষায় কত শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করল, তা দিয়ে কোনো দেশের শিক্ষার সামগ্রিক মান নির্ধারণ করা যায় না। শিক্ষার্থীরা কতটুকু শিখছে, তাদের পাঠ, ইংরেজি ও গণিতের দক্ষতা কেমন এবং অর্জিত জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে পারছে কি না, সেসব বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হয়।


ইউনেসকোর টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) চার নম্বর লক্ষ্যে মানসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নির্ধারিত বয়সে শিশুদের পাঠ ও গণিতের ন্যূনতম দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।


অন্যদিকে, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) পিসা (পিআইএসএ) পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে বাস্তব জীবনে পড়া, গণিত ও বিজ্ঞানের জ্ঞান প্রয়োগের সক্ষমতা যাচাই করা হয়। এ পরীক্ষা মূলত ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের দক্ষতা পরিমাপ করে।


এ বিষয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক তপন কুমার সরকার বলেন, বাংলাদেশের পরীক্ষার ফলাফলে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের প্রভাব ছিল। একসময় পাসের হার বাড়ানোর চাপ ছিল, আবার পরে পাসের হার কমানোর চাপ এসেছে।


ফলাফলের পরিসংখ্যানে পরিবর্তনের পেছনে প্রশ্নপত্রের ধরন, উত্তরপত্র মূল্যায়নের কঠোরতা বা শিথিলতা এবং গ্রেস মার্ক দেওয়ার মতো বিষয়ও ভূমিকা রেখেছে। এসব কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যান্য দেশের পরীক্ষার ফল সরাসরি তুলনা করা কঠিন।


বিদেশে উচ্চশিক্ষায় বাড়তে পারে চ্যালেঞ্জ

এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার কমে যাওয়ায় বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে আগ্রহী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে উচ্চমাধ্যমিকের ফল গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়।


তবে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাধারণত কোনো দেশের সামগ্রিক পাসের হারের ভিত্তিতে শিক্ষার্থী ভর্তি করে না। তারা আবেদনকারীর ব্যক্তিগত ফলাফল, বিষয়ভিত্তিক গ্রেড, ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা, ভর্তি পরীক্ষার ফল এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমসহ বিভিন্ন যোগ্যতা বিবেচনা করে।


ফলে সামগ্রিক পাসের হার কমার চেয়ে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ফল ও বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার ঘাটতি বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।


তুলনামূলক কম ফল করা শিক্ষার্থীদের পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কিংবা বৃত্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় গ্রেড বা বিষয়ভিত্তিক নম্বর না থাকলে ফাউন্ডেশন কোর্স সম্পন্ন করার শর্তও দেওয়া হতে পারে। এতে বিদেশে উচ্চশিক্ষার সময় ও ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, কত শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করলে সেটিকে ভালো ফল বলা যাবে, এমন কোনো নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নেই। কারণ প্রতিটি দেশের শিক্ষাক্রম, পাঠদান পদ্ধতি, পরীক্ষা গ্রহণ ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের ধরন আলাদা।


বাংলাদেশের এবারের ফলাফলকে গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, পাসের হার কমে যাওয়ার পেছনে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ঘাটতি, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মান, শিক্ষকদের দক্ষতা, পরীক্ষার প্রশ্নের ধরন এবং মূল্যায়ন পদ্ধতি—সবকিছুই বিবেচনায় নিতে হবে।


বিশেষ করে কোন বিষয়ে কতসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে, শহর ও গ্রামের ফলাফলে কী পার্থক্য এবং প্রতিষ্ঠানভেদে ফলের তারতম্য কতটা, সেসব তথ্য বিশ্লেষণ করা জরুরি।

পরিবর্তন সংবাদ/এসআর


দৈনিক পরিবর্তন সংবাদ

উপদেষ্টা সম্পাদক: গোলাম আকবর খন্দকার (সাবেক এমপি)
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: লেঃ কর্নেল এ কে এম রশিদুন্নবী,পিএসসি ( অবঃ)
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ শাহাদাৎ হোসেন

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত