দৈনিক পরিবর্তন সংবাদ

স্ক্যাম সেন্টার বন্ধ ও বিরল খনিজে প্রবেশাধিকারে আগ্রহ ওয়াশিংটনের, আলোচনায় সক্রিয় হচ্ছে জাপানও

মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, টোকিওতে দ্বিতীয় বৈঠক

মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, টোকিওতে দ্বিতীয় বৈঠক

 মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে যুমিয়ানমারের সামরিক জান্তা–সমর্থিত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। গত সপ্তাহে জাপানের রাজধানী টোকিওতে দুই পক্ষের কর্মকর্তারা বৈঠক করেছেন। এক মাসের মধ্যে এটি ছিল তাদের দ্বিতীয় বৈঠক। ২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটন আবারও নেপিডোর সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিন ব্যক্তি টোকিও বৈঠকের তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তাঁদের মধ্যে একজন মার্কিন কর্মকর্তা রয়েছেন। তবে বৈঠকে ঠিক কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এর আগে গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে দুই পক্ষের বৈঠক হয়েছিল। সেখানে একজন মার্কিন ব্যবসায়ীর মুক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের লক্ষ্য করে পরিচালিত প্রতারণাকেন্দ্র বা ‘স্ক্যাম সেন্টার’ বন্ধের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল। ওই আলোচনার পর মিয়ানমারের বিরল খনিজ সম্পদসহ আরও বিস্তৃত বিষয়ে আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হয়।


স্ক্যাম সেন্টার বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগ

টোকিওর সর্বশেষ বৈঠকেও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের গোয়েন্দা ও গবেষণাবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল ভ্যান্স নেতৃত্ব দেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বৈঠকে ১২ জনের বেশি মার্কিন কর্মকর্তা অংশ নিয়েছিলেন। তবে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে কারা উপস্থিত ছিলেন, তা নিশ্চিত করতে পারেনি রয়টার্স।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বৈঠকের বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য না করে জানিয়েছে, মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে মিয়ানমারের সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।

মার্কিন উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য হলো মিয়ানমারে সক্রিয় প্রতারণাকেন্দ্রগুলো বন্ধ করা। এসব কেন্দ্র থেকে প্রেমের সম্পর্কের ফাঁদসহ বিভিন্ন কৌশলে মার্কিন নাগরিকদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

গবেষকদের মতে, মিয়ানমারের জান্তা–সমর্থিত মিলিশিয়াদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে এ ধরনের অনেক প্রতারণাকেন্দ্র রয়েছে। এসব অপরাধ থেকে অর্জিত অর্থের একটি অংশ সামরিক বাহিনীর কাছেও পৌঁছায় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রতারণাকেন্দ্র বন্ধে মিয়ানমারের শাসকেরা কতটা আন্তরিক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অন্যদিকে মিয়ানমারের জান্তা–সমর্থিত সরকার দাবি করেছে, প্রতারণাকেন্দ্র দমনে তারা বহুজাতিক উদ্যোগে অংশ নিচ্ছে।


বিরল খনিজে ওয়াশিংটনের কৌশলগত আগ্রহ

প্রতারণাকেন্দ্র বন্ধের পাশাপাশি মিয়ানমারের বিরল খনিজ সম্পদেও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ রয়েছে। দেশটিতে হেভি রেয়ার আর্থ বা ভারী বিরল মৃত্তিকা খনিজের উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে। উচ্চপ্রযুক্তির বিভিন্ন পণ্য, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং বায়ুবিদ্যুৎ টারবাইন তৈরিতে এসব খনিজ ব্যবহৃত হয়।

তবে এসব সম্পদে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ হবে না। কারণ, মিয়ানমারের বিরল খনিজের বড় অংশ এমন এলাকাগুলোতে রয়েছে, যেগুলো দেশটির সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইরত জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে।

এ ছাড়া মিয়ানমারের বিরল খনিজের প্রধান ক্রেতা চীন। এই খাতে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি বাড়ানোর উদ্যোগে বেইজিং আপত্তি জানাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়ার গবেষণা প্রতিষ্ঠান লোই ইনস্টিটিউটের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক পরিচালক হান্টার মার্সটন মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন মিয়ানমারকে মূলত লেনদেনভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবেচনা করছে।

তাঁর মতে, মিয়ানমারের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও বিরল খনিজই সম্ভবত দেশটিতে ওয়াশিংটনের আগ্রহের প্রধান কৌশলগত সম্পদ।

নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ইঙ্গিত

মিয়ানমার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে পরিবর্তনের আরেকটি ইঙ্গিত পাওয়া গেছে সম্প্রতি। গত সপ্তাহে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে সহায়তার অভিযোগ থাকা এক ব্যবসায়ীর মেয়ের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, এটি মিয়ানমার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন দৃষ্টিভঙ্গির অংশ।

ওয়াশিংটনের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন পদ্ধতিতে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে জড়িত সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান স্বার্থ রক্ষায় আগে ব্যবহৃত বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপ পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে।

তবে মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানের নেতা থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া মিন অং হ্লাইং এখনো যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন। মানবাধিকার লঙ্ঘন, ২০২১ সালের অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী গণবিক্ষোভ দমনসহ বিভিন্ন অভিযোগে তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এ ছাড়া ২০১৬–১৭ সালে রোহিঙ্গা মুসলিমদের হত্যা ও বাস্তুচ্যুত করার ঘটনায় তাঁর ভূমিকার অভিযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ওই অভিযানকে গণহত্যা হিসেবে ঘোষণা করেছে।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিমান হামলায় হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন।

মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে জাপানও

টোকিওতে যুক্তরাষ্ট্র ও মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের বৈঠক আয়োজনের বাইরে জাপানের ভূমিকা কতটা, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এর আগে গত জুনেও জাপানের রাজধানীতে দুই পক্ষের আলোচনা হয়েছিল।

জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রয়োজন অনুযায়ী তারা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। তবে নির্দিষ্ট কূটনৈতিক বৈঠক নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি মন্ত্রণালয়।

চলতি মাসের শুরুতে মিয়ানমারে নিযুক্ত জাপানের ভারপ্রাপ্ত দূত দেশটির সামরিক–সমর্থিত সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এটি ছিল তাঁদের প্রথম প্রকাশ্যে জানা বৈঠক। তবে জাপান এখনো মিয়ানমারের জান্তা–সমর্থিত সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি।

এর আগে সেপ্টেম্বরে জাপানের ক্ষমতাসীন দলের আইনপ্রণেতা হিরোমিচি ওয়াতানাবে নেপিডো সফর করেন। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র গ্লোবাল নিউ লাইট অব মিয়ানমারের প্রতিবেদনে বলা হয়, দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা পুনরায় শুরু করা এবং দেশটিতে উন্নয়ন সহায়তা চালুর পরিবেশ তৈরি করাই ছিল তাঁর সফরের অন্যতম লক্ষ্য।

জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারপ্রাপ্ত দূত বৈঠকে জাপানি নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং দেশটিতে জাপানি কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমে সহায়তার বিষয়টি উত্থাপন করেন।

অন্যদিকে ওয়াতানাবে জানিয়েছেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে একজন পার্লামেন্ট সদস্য হিসেবে সফর করেছেন। ফলে তাঁর সফরকে জাপান সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।


অর্থনৈতিক স্বার্থে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা

২০২১ সালে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের নিন্দা জানিয়েছিল জাপান। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশের মতো মিয়ানমারের জান্তা নেতা এবং সামরিক বাহিনী-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি টোকিও।

সামরিক অভ্যুত্থানের আগে মিয়ানমারে অন্যতম বড় বিদেশি বিনিয়োগকারী ছিল জাপান। ২০২০ সালে দেশটিতে ৪০০টির বেশি জাপানি কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করত। জাপানের বাণিজ্য উন্নয়ন সংস্থা জেট্রোর হিসাব অনুযায়ী, এখনো প্রায় ৩০০টি জাপানি কোম্পানি মিয়ানমারে কার্যক্রম চালাচ্ছে।

সব মিলিয়ে প্রতারণাকেন্দ্র দমন, বিরল খনিজ সম্পদে প্রবেশাধিকার এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা—এই তিনটি বিষয়কে ঘিরে মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ নতুন মাত্রা পাচ্ছে। একই সময়ে জাপানের কূটনৈতিক তৎপরতাও বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তবে দেশটির চলমান গৃহযুদ্ধ, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং সামরিক শাসনের বৈধতা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণে এই যোগাযোগ ভবিষ্যতে কতটা এগোবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

পরিবর্তন সংবাদ/এসআর

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, টোকিওতে দ্বিতীয় বৈঠক
0:00 0:00
1.0x
দৈনিক পরিবর্তন সংবাদ

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬


মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, টোকিওতে দ্বিতীয় বৈঠক

প্রকাশের তারিখ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

 মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে যুমিয়ানমারের সামরিক জান্তা–সমর্থিত সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। গত সপ্তাহে জাপানের রাজধানী টোকিওতে দুই পক্ষের কর্মকর্তারা বৈঠক করেছেন। এক মাসের মধ্যে এটি ছিল তাদের দ্বিতীয় বৈঠক। ২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটন আবারও নেপিডোর সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করছে।


বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিন ব্যক্তি টোকিও বৈঠকের তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তাঁদের মধ্যে একজন মার্কিন কর্মকর্তা রয়েছেন। তবে বৈঠকে ঠিক কী বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।


এর আগে গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে দুই পক্ষের বৈঠক হয়েছিল। সেখানে একজন মার্কিন ব্যবসায়ীর মুক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের লক্ষ্য করে পরিচালিত প্রতারণাকেন্দ্র বা ‘স্ক্যাম সেন্টার’ বন্ধের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছিল। ওই আলোচনার পর মিয়ানমারের বিরল খনিজ সম্পদসহ আরও বিস্তৃত বিষয়ে আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হয়।


স্ক্যাম সেন্টার বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগ


টোকিওর সর্বশেষ বৈঠকেও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের গোয়েন্দা ও গবেষণাবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল ভ্যান্স নেতৃত্ব দেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বৈঠকে ১২ জনের বেশি মার্কিন কর্মকর্তা অংশ নিয়েছিলেন। তবে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে কারা উপস্থিত ছিলেন, তা নিশ্চিত করতে পারেনি রয়টার্স।


যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বৈঠকের বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য না করে জানিয়েছে, মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে মিয়ানমারের সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।


মার্কিন উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য হলো মিয়ানমারে সক্রিয় প্রতারণাকেন্দ্রগুলো বন্ধ করা। এসব কেন্দ্র থেকে প্রেমের সম্পর্কের ফাঁদসহ বিভিন্ন কৌশলে মার্কিন নাগরিকদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।


গবেষকদের মতে, মিয়ানমারের জান্তা–সমর্থিত মিলিশিয়াদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে এ ধরনের অনেক প্রতারণাকেন্দ্র রয়েছে। এসব অপরাধ থেকে অর্জিত অর্থের একটি অংশ সামরিক বাহিনীর কাছেও পৌঁছায় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রতারণাকেন্দ্র বন্ধে মিয়ানমারের শাসকেরা কতটা আন্তরিক, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


অন্যদিকে মিয়ানমারের জান্তা–সমর্থিত সরকার দাবি করেছে, প্রতারণাকেন্দ্র দমনে তারা বহুজাতিক উদ্যোগে অংশ নিচ্ছে।


বিরল খনিজে ওয়াশিংটনের কৌশলগত আগ্রহ


প্রতারণাকেন্দ্র বন্ধের পাশাপাশি মিয়ানমারের বিরল খনিজ সম্পদেও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহ রয়েছে। দেশটিতে হেভি রেয়ার আর্থ বা ভারী বিরল মৃত্তিকা খনিজের উল্লেখযোগ্য মজুত রয়েছে। উচ্চপ্রযুক্তির বিভিন্ন পণ্য, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং বায়ুবিদ্যুৎ টারবাইন তৈরিতে এসব খনিজ ব্যবহৃত হয়।


তবে এসব সম্পদে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সহজ হবে না। কারণ, মিয়ানমারের বিরল খনিজের বড় অংশ এমন এলাকাগুলোতে রয়েছে, যেগুলো দেশটির সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইরত জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে।


এ ছাড়া মিয়ানমারের বিরল খনিজের প্রধান ক্রেতা চীন। এই খাতে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি বাড়ানোর উদ্যোগে বেইজিং আপত্তি জানাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


অস্ট্রেলিয়ার গবেষণা প্রতিষ্ঠান লোই ইনস্টিটিউটের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক পরিচালক হান্টার মার্সটন মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন মিয়ানমারকে মূলত লেনদেনভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবেচনা করছে।


তাঁর মতে, মিয়ানমারের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও বিরল খনিজই সম্ভবত দেশটিতে ওয়াশিংটনের আগ্রহের প্রধান কৌশলগত সম্পদ।


নিষেধাজ্ঞা শিথিলের ইঙ্গিত

মিয়ানমার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে পরিবর্তনের আরেকটি ইঙ্গিত পাওয়া গেছে সম্প্রতি। গত সপ্তাহে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে সহায়তার অভিযোগ থাকা এক ব্যবসায়ীর মেয়ের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, এটি মিয়ানমার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন দৃষ্টিভঙ্গির অংশ।


ওয়াশিংটনের বক্তব্য অনুযায়ী, নতুন পদ্ধতিতে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে জড়িত সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান স্বার্থ রক্ষায় আগে ব্যবহৃত বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপ পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে।


তবে মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানের নেতা থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া মিন অং হ্লাইং এখনো যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন। মানবাধিকার লঙ্ঘন, ২০২১ সালের অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী গণবিক্ষোভ দমনসহ বিভিন্ন অভিযোগে তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। এ ছাড়া ২০১৬–১৭ সালে রোহিঙ্গা মুসলিমদের হত্যা ও বাস্তুচ্যুত করার ঘটনায় তাঁর ভূমিকার অভিযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ওই অভিযানকে গণহত্যা হিসেবে ঘোষণা করেছে।


জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিমান হামলায় হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন।


মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে জাপানও

টোকিওতে যুক্তরাষ্ট্র ও মিয়ানমারের কর্মকর্তাদের বৈঠক আয়োজনের বাইরে জাপানের ভূমিকা কতটা, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এর আগে গত জুনেও জাপানের রাজধানীতে দুই পক্ষের আলোচনা হয়েছিল।


জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রয়োজন অনুযায়ী তারা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। তবে নির্দিষ্ট কূটনৈতিক বৈঠক নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি মন্ত্রণালয়।


চলতি মাসের শুরুতে মিয়ানমারে নিযুক্ত জাপানের ভারপ্রাপ্ত দূত দেশটির সামরিক–সমর্থিত সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এটি ছিল তাঁদের প্রথম প্রকাশ্যে জানা বৈঠক। তবে জাপান এখনো মিয়ানমারের জান্তা–সমর্থিত সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি।


এর আগে সেপ্টেম্বরে জাপানের ক্ষমতাসীন দলের আইনপ্রণেতা হিরোমিচি ওয়াতানাবে নেপিডো সফর করেন। মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র গ্লোবাল নিউ লাইট অব মিয়ানমারের প্রতিবেদনে বলা হয়, দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা পুনরায় শুরু করা এবং দেশটিতে উন্নয়ন সহায়তা চালুর পরিবেশ তৈরি করাই ছিল তাঁর সফরের অন্যতম লক্ষ্য।


জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, ভারপ্রাপ্ত দূত বৈঠকে জাপানি নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং দেশটিতে জাপানি কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমে সহায়তার বিষয়টি উত্থাপন করেন।


অন্যদিকে ওয়াতানাবে জানিয়েছেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে একজন পার্লামেন্ট সদস্য হিসেবে সফর করেছেন। ফলে তাঁর সফরকে জাপান সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।


অর্থনৈতিক স্বার্থে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা

২০২১ সালে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের নিন্দা জানিয়েছিল জাপান। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশের মতো মিয়ানমারের জান্তা নেতা এবং সামরিক বাহিনী-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি টোকিও।


সামরিক অভ্যুত্থানের আগে মিয়ানমারে অন্যতম বড় বিদেশি বিনিয়োগকারী ছিল জাপান। ২০২০ সালে দেশটিতে ৪০০টির বেশি জাপানি কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করত। জাপানের বাণিজ্য উন্নয়ন সংস্থা জেট্রোর হিসাব অনুযায়ী, এখনো প্রায় ৩০০টি জাপানি কোম্পানি মিয়ানমারে কার্যক্রম চালাচ্ছে।


সব মিলিয়ে প্রতারণাকেন্দ্র দমন, বিরল খনিজ সম্পদে প্রবেশাধিকার এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা—এই তিনটি বিষয়কে ঘিরে মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ নতুন মাত্রা পাচ্ছে। একই সময়ে জাপানের কূটনৈতিক তৎপরতাও বাড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। তবে দেশটির চলমান গৃহযুদ্ধ, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং সামরিক শাসনের বৈধতা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণে এই যোগাযোগ ভবিষ্যতে কতটা এগোবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

পরিবর্তন সংবাদ/এসআর


দৈনিক পরিবর্তন সংবাদ

উপদেষ্টা সম্পাদক: গোলাম আকবর খন্দকার (সাবেক এমপি)
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: লেঃ কর্নেল এ কে এম রশিদুন্নবী,পিএসসি ( অবঃ)
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ শাহাদাৎ হোসেন

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত