দৈনিক পরিবর্তন সংবাদ
প্রকাশ : রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি: কার আয় কতটা পিছিয়ে, কার সংকট কতটা গভীর ?

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি: কার আয় কতটা পিছিয়ে, কার সংকট কতটা গভীর ?

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। এর প্রভাব শুধু পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, খাদ্যনিরাপত্তা, সঞ্চয় ও জীবনযাত্রার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মূল্যস্ফীতি হলো পণ্য ও সেবার সাধারণ মূল্যস্তরের ধারাবাহিক বৃদ্ধি। একটি পণ্যের দাম বাড়া এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি এক বিষয় নয়। তবে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হলে মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় ক্রমাগত বেড়ে যায়।

বিভিন্ন সময়ে মূল্যস্ফীতির চিত্র :

•বিশ্বব্যাংকের পঞ্জিকাবর্ষভিত্তিক উপাত্ত অনুযায়ী, ২০০১–২০২৫ সময়সীমায় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ছিল ২০১১ সালে, প্রায় ১১.৪০%। সে সময় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল। তুলনামূলকভাবে ২০০৭ সালে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.১১%, ২০০৮ সালে ৮.৯০%, ২০২২ সালে ৭.৭০%, ২০২৩ সালে ৯.৮৮%, ২০২৪ সালে ১০.৪৭% এবং ২০২৫ সালে ৮.৭৭%। ২০০৭–০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় ছিল। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের পরিসংখ্যানকে একক সরকারের পুরো সময়ের ফল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। (বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক উপাত্ত)

•২০২৬ সালের ৭ অক্টোবর প্রকাশিত BBS-এর তথ্য অনুযায়ী, ওই বছরের সেপ্টেম্বরে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩৪%; খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭.২২% এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.৩০%। আগস্টে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.২৬%। অর্থাৎ, মূল্যস্ফীতির হার কমে গেলেও পণ্যের দাম আগের পর্যায়ে ফিরে যায়নি। (BSS, ৭ অক্টোবর ২০২৬)

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণ :

মূল্যস্ফীতির পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি, টাকার অবমূল্যায়নে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া, জ্বালানি ও পরিবহন খরচ, কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহে ঘাটতি এবং বাজারে প্রতিযোগিতার দুর্বলতা। কখনো অতিরিক্ত চাহিদা, মজুতদারি বা ব্যবসায়ীদের যোগসাজশও দাম বাড়াতে পারে। তবে সব মূল্যবৃদ্ধির জন্য ব্যবসায়ীদের দায়ী করা যুক্তিসংগত নয়।

•২০২৬ সালের ৩০ জুলাই CPD দেশীয়ভাবে উৎপাদিত ১০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা বিশ্লেষণ করে। গবেষণায় ৫০০ জন খুচরা বিক্রেতাসহ মোট ৮২০ জন বাজার-সংশ্লিষ্ট অংশগ্রহণকারীর তথ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল। এতে সরবরাহের ঘাটতিকে উচ্চমূল্যের সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করা কারণ এবং যোগসাজশ ও মজুতদারিকে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। গবেষণাটি নির্বাচিত বাজারভিত্তিক হওয়ায় ফলাফলকে দেশের প্রতিটি বাজারের চিত্র বলা যাবে না। (CPD, ৩০ জুলাই ২০২৬)

কোন শ্রেণি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ?

দরিদ্র পরিবার, দিনমজুর, অনানুষ্ঠানিক শ্রমিক এবং সীমিত বা নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ সাধারণত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। কারণ তাঁদের আয়ের বড় অংশ খাদ্যে ব্যয় হয়, অথচ সঞ্চয় ও অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ সীমিত।

•CPD-এর ২০২৬ সালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দরিদ্রতম ৫% মানুষের ভোগব্যয়ের ৫৯.৮% খাদ্যে ব্যয় হয়; ধনীতম ৫% মানুষের ক্ষেত্রে অনুপাতটি ২৮.৯%। তাই খাদ্যমূল্যের বৃদ্ধি দরিদ্র মানুষের বাজেটে তুলনামূলক বড় চাপ সৃষ্টি করে। (CPD)

•BBS-এর Living Standard Survey 2025 অনুসারে, জাতীয় পর্যায়ে পরিবারের গড় মাসিক আয় ছিল ৩৩,৫১৩ টাকা, আর ব্যয় ৩৫,৩১১ টাকা। জরিপে অন্তর্ভুক্ত ৩,০০০ পরিবারের মধ্যে ৪৭.৪২% জানিয়েছে, গত এক বছরে মৌলিক ব্যয় মেটাতে তাদের ঋণ নিতে হয়েছে। গ্রামীণ পরিবারে এই হার ছিল ৫১.৯১%, শহরাঞ্চলে ৪০.১৯% এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩২.১১%। এটি ২০২৫ সালের জরিপের ফল; বর্তমান সময়ের প্রতিটি পরিবারের আর্থিক অবস্থার সরাসরি পরিমাপ নয়। (The Daily Star, ১৮ অক্টোবর ২০২৬)

•বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দুর্বল কর্মসংস্থান ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে অর্থবছর ২০২৫–২৬-এ আগের বছরের তুলনায় আরও প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে বলে অনুমান করা হয়েছে। এই পরিবর্তন শুধু মূল্যস্ফীতির ফল নয়; কর্মসংস্থান, প্রবৃদ্ধি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কারণও গুরুত্বপূর্ণ। (বিশ্বব্যাংক, ৬ অক্টোবর ২০২৬)

মানুষের আয় কি দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে তাল মেলাচ্ছে?

•BBS-এর সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ শ্রমজীবীদের মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭.৯০%, যেখানে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩৪%। অর্থাৎ, মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে ০.৪৪ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরে টানা ৫৬ মাস ধরে মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে ছিল। তবে মজুরি সূচকটি কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের ৬৩টি পেশায় কর্মরত অপেক্ষাকৃত কম মজুরির শ্রমিকদের নিয়ে তৈরি; এটি দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীর বেতন বৃদ্ধির হার নয়। (The Daily Star, ১৮ অক্টোবর ২০২৬)

সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের পরিস্থিতি :

•২০২৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত নবম জাতীয় বেতনকাঠামোতে সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে ২০,০০০ টাকা এবং প্রথম গ্রেডের বেতন ৭৮,০০০ টাকা থেকে ১,৫৬,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বৃদ্ধি যথাক্রমে প্রায় ১৪২% ও ১০০%। তবে বর্ধিত মূল বেতন ধাপে ধাপে কার্যকর হচ্ছে; পূর্ণ বর্ধিত মূল বেতন ১ জুলাই ২০২৭ থেকে এবং নতুন ভাতার হার ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। (The Business Standard, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬)

বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার যৌগিকভাবে হিসাব করলে ২০১৬–২০২৫ সময়ে সাধারণ মূল্যস্তর আনুমানিক ৯৭% বেড়েছে। তবে এই হিসাবকে নতুন বেতনকাঠামোর সঙ্গে সরাসরি তুলনা করে প্রত্যেক কর্মচারীর প্রকৃত বেতনবৃদ্ধি নির্ধারণ করা যায় না; বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি, ভাতা ও কর্মচারীর বর্তমান বেতনও বিবেচনা করতে হয়।

সরকারি চাকরিতে নির্ধারিত বেতনকাঠামো ও তুলনামূলক চাকরির স্থায়িত্ব থাকায় আয়ের পূর্বানুমানযোগ্যতা বেশি। কিন্তু নিম্ন গ্রেডের কর্মচারী ও একক উপার্জনকারী পরিবারের জন্য নতুন বেতনও অপরিহার্য ব্যয়ের তুলনায় অপ্রতুল হতে পারে। বেসরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে বেতন ও সুবিধা প্রতিষ্ঠানভেদে ভিন্ন। উচ্চ বেতনের পেশাজীবীরা স্বচ্ছন্দে থাকতে পারেন, অথচ সীমিত বেতন ও অনিশ্চিত চাকরির কর্মীদের জন্য চাপ বেশি হয়। সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতার সরাসরি তুলনার উপযোগী জাতীয় উপাত্ত না থাকায় কোন শ্রেণি কত শতাংশ বেশি চাপ সামলাতে পারে, তা নির্ভরযোগ্যভাবে নির্ধারণ করা যায় না।

উত্তরণের উপায় :

মূল্যস্ফীতি সহনীয় করতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর মুদ্রানীতি ও সরকারের দক্ষ ব্যয় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কৃষি উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও আমদানি ব্যবস্থার উন্নতি করে সরবরাহের ঘাটতি কমাতে হবে। তৃতীয়ত, উৎপাদক থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত দাম ও ব্যয়ের তথ্য প্রকাশ এবং প্রমাণিত যোগসাজশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। চতুর্থত, দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তা, কম দামে খাদ্যপণ্য এবং কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা দিতে হবে। পঞ্চমত, মজুরি ও বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মধ্যবিত্তের বাড়িভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াতের চাপ কমানোর দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নিতে হবে। নির্বিচারে ভর্তুকি বা শুধু দাম বেঁধে দেওয়ার পরিবর্তে সরবরাহ, প্রতিযোগিতা ও উপকারভোগী নির্বাচনের সমস্যাগুলো সমাধান করা বেশি কার্যকর।

শেষ কথা:

বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি শুধু মূল্যস্ফীতির সমস্যা নয়; এর সঙ্গে উৎপাদন, আমদানি, বাজারব্যবস্থা, প্রকৃত আয় ও সামাজিক সুরক্ষার সম্পর্ক রয়েছে। তাই শুধু বেতন বৃদ্ধি বা বাজার অভিযান দিয়ে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, প্রতিযোগিতামূলক বাজার, পর্যাপ্ত সরবরাহ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। সাফল্য বিচার করতে হবে শুধু দাম বাড়ার হার দিয়ে নয়, বরং মানুষ কতটা পণ্য কিনতে পারছে, খাদ্যনিরাপত্তা বজায় রাখতে পারছে কি না এবং অপরিহার্য ব্যয়ের পর সঞ্চয় করতে পারছে কি না—এসব সূচকের ভিত্তিতে।


লেখক:

নাম: তাহমিদা খানম 

শিক্ষার্থী: ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি: কার আয় কতটা পিছিয়ে, কার সংকট কতটা গভীর ?
0:00 0:00
1.0x
দৈনিক পরিবর্তন সংবাদ

সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬


দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি: কার আয় কতটা পিছিয়ে, কার সংকট কতটা গভীর ?

প্রকাশের তারিখ : ২৫ অক্টোবর ২০২৬

featured Image


দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। এর প্রভাব শুধু পণ্যের দাম বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, খাদ্যনিরাপত্তা, সঞ্চয় ও জীবনযাত্রার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মূল্যস্ফীতি হলো পণ্য ও সেবার সাধারণ মূল্যস্তরের ধারাবাহিক বৃদ্ধি। একটি পণ্যের দাম বাড়া এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি এক বিষয় নয়। তবে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হলে মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় ক্রমাগত বেড়ে যায়।


বিভিন্ন সময়ে মূল্যস্ফীতির চিত্র :

•বিশ্বব্যাংকের পঞ্জিকাবর্ষভিত্তিক উপাত্ত অনুযায়ী, ২০০১–২০২৫ সময়সীমায় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ছিল ২০১১ সালে, প্রায় ১১.৪০%। সে সময় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল। তুলনামূলকভাবে ২০০৭ সালে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.১১%, ২০০৮ সালে ৮.৯০%, ২০২২ সালে ৭.৭০%, ২০২৩ সালে ৯.৮৮%, ২০২৪ সালে ১০.৪৭% এবং ২০২৫ সালে ৮.৭৭%। ২০০৭–০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় ছিল। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের পরিসংখ্যানকে একক সরকারের পুরো সময়ের ফল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। (বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক উপাত্ত)


•২০২৬ সালের ৭ অক্টোবর প্রকাশিত BBS-এর তথ্য অনুযায়ী, ওই বছরের সেপ্টেম্বরে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩৪%; খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭.২২% এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.৩০%। আগস্টে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.২৬%। অর্থাৎ, মূল্যস্ফীতির হার কমে গেলেও পণ্যের দাম আগের পর্যায়ে ফিরে যায়নি। (BSS, ৭ অক্টোবর ২০২৬)


দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণ :

মূল্যস্ফীতির পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি, টাকার অবমূল্যায়নে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া, জ্বালানি ও পরিবহন খরচ, কৃষিপণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহে ঘাটতি এবং বাজারে প্রতিযোগিতার দুর্বলতা। কখনো অতিরিক্ত চাহিদা, মজুতদারি বা ব্যবসায়ীদের যোগসাজশও দাম বাড়াতে পারে। তবে সব মূল্যবৃদ্ধির জন্য ব্যবসায়ীদের দায়ী করা যুক্তিসংগত নয়।


•২০২৬ সালের ৩০ জুলাই CPD দেশীয়ভাবে উৎপাদিত ১০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা বিশ্লেষণ করে। গবেষণায় ৫০০ জন খুচরা বিক্রেতাসহ মোট ৮২০ জন বাজার-সংশ্লিষ্ট অংশগ্রহণকারীর তথ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল। এতে সরবরাহের ঘাটতিকে উচ্চমূল্যের সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করা কারণ এবং যোগসাজশ ও মজুতদারিকে পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। গবেষণাটি নির্বাচিত বাজারভিত্তিক হওয়ায় ফলাফলকে দেশের প্রতিটি বাজারের চিত্র বলা যাবে না। (CPD, ৩০ জুলাই ২০২৬)


কোন শ্রেণি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ?

দরিদ্র পরিবার, দিনমজুর, অনানুষ্ঠানিক শ্রমিক এবং সীমিত বা নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ সাধারণত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। কারণ তাঁদের আয়ের বড় অংশ খাদ্যে ব্যয় হয়, অথচ সঞ্চয় ও অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ সীমিত।


•CPD-এর ২০২৬ সালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দরিদ্রতম ৫% মানুষের ভোগব্যয়ের ৫৯.৮% খাদ্যে ব্যয় হয়; ধনীতম ৫% মানুষের ক্ষেত্রে অনুপাতটি ২৮.৯%। তাই খাদ্যমূল্যের বৃদ্ধি দরিদ্র মানুষের বাজেটে তুলনামূলক বড় চাপ সৃষ্টি করে। (CPD)


•BBS-এর Living Standard Survey 2025 অনুসারে, জাতীয় পর্যায়ে পরিবারের গড় মাসিক আয় ছিল ৩৩,৫১৩ টাকা, আর ব্যয় ৩৫,৩১১ টাকা। জরিপে অন্তর্ভুক্ত ৩,০০০ পরিবারের মধ্যে ৪৭.৪২% জানিয়েছে, গত এক বছরে মৌলিক ব্যয় মেটাতে তাদের ঋণ নিতে হয়েছে। গ্রামীণ পরিবারে এই হার ছিল ৫১.৯১%, শহরাঞ্চলে ৪০.১৯% এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩২.১১%। এটি ২০২৫ সালের জরিপের ফল; বর্তমান সময়ের প্রতিটি পরিবারের আর্থিক অবস্থার সরাসরি পরিমাপ নয়। (The Daily Star, ১৮ অক্টোবর ২০২৬)


•বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দুর্বল কর্মসংস্থান ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে অর্থবছর ২০২৫–২৬-এ আগের বছরের তুলনায় আরও প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে বলে অনুমান করা হয়েছে। এই পরিবর্তন শুধু মূল্যস্ফীতির ফল নয়; কর্মসংস্থান, প্রবৃদ্ধি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কারণও গুরুত্বপূর্ণ। (বিশ্বব্যাংক, ৬ অক্টোবর ২০২৬)


মানুষের আয় কি দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে তাল মেলাচ্ছে?

•BBS-এর সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ শ্রমজীবীদের মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭.৯০%, যেখানে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩৪%। অর্থাৎ, মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে ০.৪৪ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরে টানা ৫৬ মাস ধরে মূল্যস্ফীতি মজুরি বৃদ্ধিকে ছাড়িয়ে ছিল। তবে মজুরি সূচকটি কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের ৬৩টি পেশায় কর্মরত অপেক্ষাকৃত কম মজুরির শ্রমিকদের নিয়ে তৈরি; এটি দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীর বেতন বৃদ্ধির হার নয়। (The Daily Star, ১৮ অক্টোবর ২০২৬)


সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের পরিস্থিতি :

•২০২৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত নবম জাতীয় বেতনকাঠামোতে সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে ২০,০০০ টাকা এবং প্রথম গ্রেডের বেতন ৭৮,০০০ টাকা থেকে ১,৫৬,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বৃদ্ধি যথাক্রমে প্রায় ১৪২% ও ১০০%। তবে বর্ধিত মূল বেতন ধাপে ধাপে কার্যকর হচ্ছে; পূর্ণ বর্ধিত মূল বেতন ১ জুলাই ২০২৭ থেকে এবং নতুন ভাতার হার ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। (The Business Standard, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬)


বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার যৌগিকভাবে হিসাব করলে ২০১৬–২০২৫ সময়ে সাধারণ মূল্যস্তর আনুমানিক ৯৭% বেড়েছে। তবে এই হিসাবকে নতুন বেতনকাঠামোর সঙ্গে সরাসরি তুলনা করে প্রত্যেক কর্মচারীর প্রকৃত বেতনবৃদ্ধি নির্ধারণ করা যায় না; বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি, ভাতা ও কর্মচারীর বর্তমান বেতনও বিবেচনা করতে হয়।


সরকারি চাকরিতে নির্ধারিত বেতনকাঠামো ও তুলনামূলক চাকরির স্থায়িত্ব থাকায় আয়ের পূর্বানুমানযোগ্যতা বেশি। কিন্তু নিম্ন গ্রেডের কর্মচারী ও একক উপার্জনকারী পরিবারের জন্য নতুন বেতনও অপরিহার্য ব্যয়ের তুলনায় অপ্রতুল হতে পারে। বেসরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে বেতন ও সুবিধা প্রতিষ্ঠানভেদে ভিন্ন। উচ্চ বেতনের পেশাজীবীরা স্বচ্ছন্দে থাকতে পারেন, অথচ সীমিত বেতন ও অনিশ্চিত চাকরির কর্মীদের জন্য চাপ বেশি হয়। সরকারি ও বেসরকারি কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতার সরাসরি তুলনার উপযোগী জাতীয় উপাত্ত না থাকায় কোন শ্রেণি কত শতাংশ বেশি চাপ সামলাতে পারে, তা নির্ভরযোগ্যভাবে নির্ধারণ করা যায় না।


উত্তরণের উপায় :

মূল্যস্ফীতি সহনীয় করতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যকর মুদ্রানীতি ও সরকারের দক্ষ ব্যয় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কৃষি উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও আমদানি ব্যবস্থার উন্নতি করে সরবরাহের ঘাটতি কমাতে হবে। তৃতীয়ত, উৎপাদক থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত দাম ও ব্যয়ের তথ্য প্রকাশ এবং প্রমাণিত যোগসাজশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। চতুর্থত, দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারকে লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তা, কম দামে খাদ্যপণ্য এবং কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা দিতে হবে। পঞ্চমত, মজুরি ও বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সম্পর্ক পর্যবেক্ষণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মধ্যবিত্তের বাড়িভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াতের চাপ কমানোর দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নিতে হবে। নির্বিচারে ভর্তুকি বা শুধু দাম বেঁধে দেওয়ার পরিবর্তে সরবরাহ, প্রতিযোগিতা ও উপকারভোগী নির্বাচনের সমস্যাগুলো সমাধান করা বেশি কার্যকর।


শেষ কথা:

বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি শুধু মূল্যস্ফীতির সমস্যা নয়; এর সঙ্গে উৎপাদন, আমদানি, বাজারব্যবস্থা, প্রকৃত আয় ও সামাজিক সুরক্ষার সম্পর্ক রয়েছে। তাই শুধু বেতন বৃদ্ধি বা বাজার অভিযান দিয়ে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, প্রতিযোগিতামূলক বাজার, পর্যাপ্ত সরবরাহ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। সাফল্য বিচার করতে হবে শুধু দাম বাড়ার হার দিয়ে নয়, বরং মানুষ কতটা পণ্য কিনতে পারছে, খাদ্যনিরাপত্তা বজায় রাখতে পারছে কি না এবং অপরিহার্য ব্যয়ের পর সঞ্চয় করতে পারছে কি না—এসব সূচকের ভিত্তিতে।


লেখক:

নাম: তাহমিদা খানম 

শিক্ষার্থী: ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।


দৈনিক পরিবর্তন সংবাদ

উপদেষ্টা সম্পাদক: গোলাম আকবর খন্দকার (সাবেক এমপি)
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: লেঃ কর্নেল এ কে এম রশিদুন্নবী,পিএসসি ( অবঃ)
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ শাহাদাৎ হোসেন

কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত