গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়িয়েছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ১ টাকা ৫২ পয়সা, যা জুন মাস থেকেই কার্যকর হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ, শিল্প উদ্যোক্তা ও ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই মূল্যবৃদ্ধি সরকারের ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমালেও এর প্রভাব পড়বে পুরো অর্থনীতিতে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, শিল্পখাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ এবং শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে এর বোঝা বহন করতে হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এসব খাতের ব্যয় বাড়লে কৃষি, শিল্প, পরিবহন ও সেবাখাতসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায়। ফলে বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিন বিপুল ভর্তুকি দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। তবে বিদ্যুৎ খাতের সিস্টেম লস, উৎপাদন না করেও ক্যাপাসিটি চার্জ প্রদান এবং বিভিন্ন কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে মানুষের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তার মতে, বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং বিতরণ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো জরুরি।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকারের ভর্তুকির চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্কার কর্মসূচির অংশ হিসেবেও জ্বালানি খাতে মূল্য সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়েছে। ফলে সরকারকে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরই পড়বে। তিনি সতর্ক করে বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি শিল্প, কৃষি, পরিবহন ও রপ্তানিমুখী খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, একদিকে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া হলেও অন্যদিকে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানির দাম বাড়ানো হলে সেই সহায়তার কার্যকারিতা অনেকটাই কমে যায়। মানুষের আয় না বাড়লেও জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ খাতে সিস্টেম লস, দুর্নীতি ও অনিয়মের সমাধান না করেই তার দায় সাধারণ গ্রাহকদের ওপর চাপানো হচ্ছে। তিনি নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের জন্য বিশেষ সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) ঘোষণায় জানানো হয়েছে, নতুন মূল্য অনুযায়ী খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম হবে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা এবং পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট ৮ টাকা ৩৯ পয়সা। তবে ডিমান্ড চার্জ বা ডিমান্ড ফি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতের সংকট সমাধান সম্ভব নয়। সিস্টেম লস কমানো, সুশাসন নিশ্চিত করা, ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা হ্রাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগবান্ধব অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান খুঁজতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন :