ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬
উদ্বেগ বাড়ছে শ্রমবাজারে

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে বিদেশে কর্মী পাঠানো কমেছে ৪১ শতাংশ

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৫ জুন, ২০২৬, ০২:১৫ দুপুর

ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা ও আঞ্চলিক অস্থিরতার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতে। চলতি বছরের মার্চ থেকে মে—এই তিন মাসে বিদেশে কাজের উদ্দেশ্যে যাওয়া বাংলাদেশি কর্মীর সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪১ শতাংশ কমেছে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আগামী মাসগুলোতে জনশক্তি রপ্তানি আরও বড় সংকটে পড়তে পারে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য দেশ ছেড়েছেন ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬৩৬ জন বাংলাদেশি। অথচ ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৬০ হাজার ৪৩৮ জন। ফলে এক বছরের ব্যবধানে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে যারা বিদেশে যাচ্ছেন, তাদের অধিকাংশের ভিসা ও নিয়োগ প্রক্রিয়া আগেই সম্পন্ন হয়েছিল। নতুন করে শ্রমিক চাহিদা কমে গেলে আগামী কয়েক মাসে এর প্রকৃত প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা) বলছে, বর্তমানে সৌদি আরব ছাড়া বড় কোনো শ্রমবাজার তেমন সক্রিয় নেই। সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিয়োগ সীমিত, কাতার ও কুয়েতে তুলনামূলক কমসংখ্যক কর্মী যাচ্ছেন, আর মালয়েশিয়ার বাজার এখনো বন্ধ রয়েছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশে সুযোগ তৈরি হলেও ভিসা ও কনস্যুলার জটিলতার কারণে তা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতির পাশাপাশি এটি মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে মৌসুমি ধীরগতির সময়ও। সাধারণত রমজান থেকে হজ মৌসুম পর্যন্ত নতুন কর্মী নিয়োগের হার কিছুটা কম থাকে। তবে হজ-পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে নতুন চাহিদা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন আয়োজনকে ঘিরে অবকাঠামো ও সেবাখাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। তাই ওই অঞ্চলের যেকোনো রাজনৈতিক বা সামরিক অস্থিরতা দেশের শ্রমবাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপ এবং নতুন সম্ভাবনাময় বাজারগুলোতে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর উদ্যোগ জোরদার করতে হবে। এর জন্য ভাষা শিক্ষা, কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

অন্যদিকে বিদেশে কর্মী পাঠানোর হার কমলেও প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে এসেছে এক হাজার ৩০ কোটি ৪৫ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার সমপরিমাণ রেমিট্যান্স। আগের বছরের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ৯০১ কোটি ৭৫ লাখ ২০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে প্রায় ১২৯ কোটি ডলার।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে সরকারি প্রণোদনা, নজরদারি বৃদ্ধি এবং যুদ্ধ পরিস্থিতিতে প্রবাসীদের সঞ্চিত অর্থ দেশে পাঠানোর প্রবণতা বাড়ার কারণেই রেমিট্যান্সে এই প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। তবে বৈদেশিক কর্মসংস্থান দীর্ঘ সময় ধরে সংকুচিত থাকলে ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স আয়েও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সংশ্লিষ্টদের অভিমত, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিরতা দ্রুত নিরসন না হলে বাংলাদেশের শ্রমবাজার, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই নতুন শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

Link copied!