আপাতদৃষ্টিতে ইরানের রাজনৈতিক আকাশে যেন আপাত শান্তি। খামেনি শাসন টিকে আছে, বড় ধরনের গণঅভ্যুত্থান আপাতত স্তিমিত। কিন্তু এই নিস্তব্ধতার নিচে বইছে এক অবিরাম প্রতিবাদী স্রোত—যার অগ্রভাগে রয়েছেন ইরানের নারীরা। রাজপথে, কারাগারে কিংবা আন্তর্জাতিক মঞ্চে—ইরানের নারীরা বারবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন রাষ্ট্রীয় অনুশাসন ও ক্ষমতার কাঠামোকে। কেন তারা বারবার একাট্টা হন, কেন এই ‘অবাধ্যতা’ থামানো যায় না—তার উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় ইরানের দীর্ঘ সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাসে।
ইরানের নারীরা একদিকে পাহলভি আমলের অতিরিক্ত পাশ্চাত্য অনুকরণ, অন্যদিকে খামেনি আমলের কঠোর ধর্মীয় বিধিনিষেধ—এই দুই বিপরীত মেরুর মাঝখানে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করছেন। কাজার রাজবংশের সময় নারীরা ছিলেন প্রায় সম্পূর্ণ গৃহবন্দি। শিক্ষা, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণ ছিল সীমিত। পাহলভি শাসনামলে আধুনিকীকরণের ঢেউয়ে নারীরা শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে এগোলেও, সেই পরিবর্তন অনেক সময় সমাজের নিজস্ব গতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে।
১৯৭৯ সালের বিপ্লব নারীদের সামনে নতুন প্রত্যাশার দুয়ার খুলেছিল। নারী-পুরুষ, বাম-ডান—সব পক্ষই বিপ্লবে অংশ নেয়। কিন্তু ক্ষমতা সংহত হওয়ার পর দ্রুতই দৃশ্যপট বদলে যায়। কট্টর ধর্মীয় শাসনের অধীনে নারীদের ওপর আরোপিত হয় পোশাক, চলাফেরা ও ব্যক্তিগত জীবনের কঠোর নিয়ন্ত্রণ। এখান থেকেই শুরু হয় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষোভ।
এই ক্ষোভ সবচেয়ে বিস্ফোরক রূপ নেয় ২০২২ সালে মাশা আমিনির মৃত্যুকে ঘিরে। সরকারি হিজাব বিধি না মানার অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর পুলিশি হেফাজতে তার মৃত্যুর খবর মুহূর্তেই ইরানের ভেতরে-বাইরে প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে দেয়। হাসপাতাল থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে কুর্দিস্তানসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। সরকার কঠোর দমননীতি, ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা বাহিনী নামিয়ে আন্দোলন থামাতে সক্ষম হলেও, নারীদের মনে জমে থাকা ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি।
এরপর একের পর এক ঘটনা সেই ক্ষোভকে আরও উসকে দেয়। খামেনি প্রশাসনের শীর্ষ উপদেষ্টার পারিবারিক অনুষ্ঠানে পশ্চিমা পোশাক পরা নারীদের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দ্বিচারিতার অভিযোগকে আরও দৃশ্যমান করে তোলে। শাসনের ভেতরের এই বৈপরীত্য সাধারণ নারীদের কাছে প্রশ্ন তোলে—আইন কি সবার জন্য সমান?
এই প্রেক্ষাপটে আবার সামনে আসেন মানবাধিকারকর্মী নার্গিস মোহাম্মদী। নারীদের অধিকার ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের সংগ্রামের জন্য শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া এই কর্মীকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের অভিযোগ নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। তার দীর্ঘ কারাবাস ইরানের নারীদের কাছে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে।
ইরানের নারীদের আন্দোলন কেবল পোশাকের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। মূল প্রশ্নটি স্বাধীনতা ও পছন্দের অধিকার নিয়ে। হিজাব হোক কিংবা খোলামেলা পোশাক—নারীরা সিদ্ধান্ত নিতে চান নিজেরা। অনেক ইরানি নারী মনে করেন, তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক সংস্কৃতি তুরস্কের মতো মধ্যপন্থী; যেখানে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সহাবস্থান সম্ভব।
দেশের ভেতরের অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব এই ক্ষোভকে আরও তীব্র করে তুলেছে। পাশাপাশি বিদেশে বসবাসরত ইরানি নারীরাও এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। পশ্চিমা বিশ্বের রাজনীতি, গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সংগঠনে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা এসব নারীর কণ্ঠ ইরানের অভ্যন্তরীণ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করছে।
তবে ইরানের নারী সমাজ একরঙা নয়। কেউ সরকারপন্থী, কেউ নিরপেক্ষ, কেউ নীরব। আবার কেউ সরাসরি পরিবর্তনের পক্ষে সোচ্চার। এই বৈচিত্র্যই আন্দোলনকে একদিকে শক্তিশালী করে, অন্যদিকে সীমাবদ্ধতাও তৈরি করে।
বিশ্লেষকদের মতে, খামেনি প্রশাসন যদি সময় থাকতেই নারীদের পোশাক ও ব্যক্তিগত জীবনে স্বাধীনতা নিশ্চিত করত, তবে সংঘাতের তীব্রতা অনেকটাই কমানো যেত। বাস্তবে কিছু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ শিথিল হলেও কাঠামোগত পরিবর্তন এখনো অনুপস্থিত।
ইরানের ‘অবাধ্য কন্যাদের’ আন্দোলন তাই কেবল একটি রাজনৈতিক লড়াই নয়; এটি পরিচয়, মর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের দীর্ঘ সংগ্রাম। এই সংগ্রাম কত দূর যাবে, তা অনিশ্চিত। তবে এটুকু স্পষ্ট—এই কণ্ঠ আর আগের মতো সহজে স্তব্ধ করা যাবে না।

আপনার মতামত লিখুন :