প্রিন্ট এর তারিখ : ০২ নভেম্বর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০২ নভেম্বর ২০২৬
কবি অরুণ মিত্র: নিচু স্বরের কবিতায় মানবমুক্তি ও সাম্যের স্বপ্ন
মুন্নি আক্তার, সম্পাদকীয় বিভাগ ||
রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কবিতার ইতিহাসে স্বতন্ত্র কাব্যভাষা ও জীবনঘনিষ্ঠ ভাবনার জন্য স্মরণীয় কবি অরুণ মিত্র। কবিতা, প্রবন্ধ, সাংবাদিকতা ও অনুবাদ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। তাঁর লেখায় উঠে এসেছে সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, সামাজিক বৈষম্য, সাম্যবাদী চেতনা, প্রেম, প্রকৃতি ও নাগরিক জীবনের নানা দ্বন্দ্ব।উচ্চকণ্ঠ স্লোগান কিংবা শব্দের বাহুল্যের পরিবর্তে সহজ ভাষা ও মৃদু স্বগতোক্তির মধ্য দিয়ে তিনি প্রকাশ করেছেন গভীর জীবনবোধ। এ কারণেই বাংলা কবিতায় তিনি গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব এক অবস্থান।যশোরে জন্ম, কলকাতায় সাহিত্যজীবনের বিকাশ১৯০৯ সালের ২ নভেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের যশোর শহরে জন্মগ্রহণ করেন অরুণ মিত্র। বাবা হীরালাল মিত্র এবং মা যামিনীবালা দেবী। শৈশবের একটি বড় সময় কেটেছে যশোরের শহর ও গ্রামঘেঁষা পরিবেশে। সেখানকার প্রকৃতি, সাধারণ মানুষের জীবনযাপন এবং সাংস্কৃতিক আবহ তাঁর সাহিত্যিক মনন গঠনে প্রভাব ফেলে।পরবর্তী সময়ে পড়াশোনার জন্য কলকাতায় চলে যান তিনি। বঙ্গবাসী স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর বঙ্গবাসী কলেজ ও রিপন কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯৩০ সালে ডিস্টিংশনসহ বিএ পাস করেন। পারিবারিক দায়িত্বের কারণে উচ্চশিক্ষা অসমাপ্ত রেখে ১৯৩১ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরু করেন।সাংবাদিকতা থেকে ফরাসি সাহিত্যের অধ্যাপনাআনন্দবাজার পত্রিকায় কাজ করার সময় বিভিন্ন সাংবাদিক, লেখক ও বুদ্ধিজীবীর সংস্পর্শে আসেন অরুণ মিত্র। এ সময় মার্ক্সবাদী চিন্তাধারার প্রতিও তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। যুক্ত হন বঙ্গীয় প্রগতি লেখক সংঘ ও সোভিয়েত সুহৃদ সমিতির সঙ্গে। ১৯৪২ সালে আনন্দবাজার ছেড়ে যোগ দেন ‘অরণি’ পত্রিকায়।১৯৪৮ সালে ফরাসি সরকারের বৃত্তি নিয়ে গবেষণার জন্য ফ্রান্সে যান তিনি। প্যারিসের সরবন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা শেষে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫২ সালে দেশে ফিরে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। দীর্ঘ দুই দশক সেখানে শিক্ষকতা করার পর ১৯৭২ সালে অবসর নিয়ে কলকাতায় ফিরে আসেন।‘প্রান্তরেখা’ দিয়ে কাব্যযাত্রার শুরু১৯৪৩ সালে প্রকাশিত হয় অরুণ মিত্রের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রান্তরেখা’। এই গ্রন্থের কবিতায় ফ্যাসিবাদবিরোধী চেতনা, আন্তর্জাতিক সংহতি ও সাধারণ মানুষের সংগ্রামের প্রতিফলন দেখা যায়।পরবর্তী সময়ে ‘উৎসের দিকে’, ‘ঘনিষ্ঠ তাপ’, ‘মঞ্চের বাইরে মাটিতে’, ‘শুধু রাতের শব্দ নয়’ এবং ‘প্রথম পলি শেষ পাথর’সহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় তাঁর।প্রথাগত ছন্দের পরিবর্তে গদ্যকবিতার মাধ্যমে নিজের ভাবনা প্রকাশে বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন তিনি। তাঁর কবিতায় কথ্য ভাষার সাবলীলতা, সহজ শব্দের ব্যবহার এবং গভীর উপলব্ধি একসঙ্গে ধরা পড়ে।মানুষ, সাম্য ও সংগ্রাম ছিল কবিতার মূল উপজীব্যঅরুণ মিত্রের কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল মানুষকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। শ্রমজীবী মানুষের জীবনসংগ্রাম, সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা তাঁর লেখায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।‘রিকশাওয়ালা’, ‘সুকান্ত’, ‘লাল ইস্তাহার’ ও ‘কসাকের ডাক’সহ বিভিন্ন কবিতায় উঠে এসেছে সময়, সমাজ ও মানুষের অস্তিত্বের নানা দিক। তবে তাঁর কবিতায় সাম্যবাদী চিন্তা কখনো কেবল রাজনৈতিক স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং মানবিক অনুভূতি ও জীবনঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তা প্রকাশ পেয়েছে।কলকাতার নাগরিক জীবন, বাংলার প্রকৃতি এবং মানুষের প্রতি গভীর মমতাও তাঁর কবিতাকে দিয়েছে স্বতন্ত্র মাত্রা।ফরাসি কবিতার অনুবাদেও রেখেছেন অবদানফরাসি ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি অরুণ মিত্রের অনুরাগ ছিল আজীবন। তিনি ফরাসি ভাষা থেকে বহু কবিতা বাংলায় অনুবাদ করেছেন। বিশেষ করে পল এল্যুয়ার, লুই আরাগঁ ও স্যাঁ-জন পার্সের সাহিত্যকর্ম তাঁকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল।তাঁর অনুবাদ ও প্রবন্ধের মাধ্যমে বাংলা ভাষার পাঠকের কাছে ফরাসি সাহিত্য নতুনভাবে পরিচিতি পায়। ‘ফরাসি সাহিত্য প্রসঙ্গে’ ও ‘সৃজন সাহিত্য ও অন্যান্য ভাবনা’ তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগ্রন্থ।এ ছাড়া ‘শিকড় যদি চেনা যায়’ তাঁর একমাত্র উপন্যাস, যেখানে যশোর থেকে কলকাতা পর্যন্ত জীবনের নানা স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে।পেয়েছেন দেশ-বিদেশের সম্মাননাসাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৯ সালে ‘শুধু রাতের শব্দ নয়’ কাব্যগ্রন্থের জন্য রবীন্দ্র পুরস্কার পান অরুণ মিত্র। ১৯৮৭ সালে একই কাব্যগ্রন্থের জন্য লাভ করেন সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার।১৯৯০ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট. উপাধিতে ভূষিত করে। ফরাসি ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯২ সালে ফরাসি সরকার তাঁকে ‘লিজিয়ন অব অনার’ সম্মানে ভূষিত করে।২০০০ সালের ২২ আগস্ট কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন কবি অরুণ মিত্র। তবে তাঁর সাহিত্যকর্ম ও কাব্যভাবনা আজও বাংলা সাহিত্যের পাঠক ও গবেষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।উচ্চকিত শব্দের পরিবর্তে সহজ ভাষায় মানুষের কথা বলার যে স্বতন্ত্র কাব্যধারা তিনি নির্মাণ করেছিলেন, তা তাঁকে রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কবিতার ইতিহাসে বিশেষ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।পরিবর্তন সংবাদ/এসআর
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত