প্রিন্ট এর তারিখ : ২৫ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৫ অক্টোবর ২০২৬
কওমে লুতের ভয়াবহ পরিণতি: কোরআনের সতর্কবার্তা ও আজকের সমাজ
শাহ নেওয়াজ নিজাম ||
দেশে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ ও বলাৎকারের অভিযোগে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ধারাবাহিক খবর জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। এসব ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলার সংকট নয়; বরং পরিবার, নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলছে। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে অতীতের জাতিগুলোর পরিণতি পর্যালোচনা করলে অন্যায় থেকে বিরত থাকা এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষার গুরুত্ব নতুন করে উপলব্ধি করা যায়। এ প্রসঙ্গে হজরত লুত (আ.)-এর সম্প্রদায়—কওমে লুতের ঘটনা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।কওমে লুতের অপরাধ ও অবাধ্যতাপবিত্র কোরআনের একাধিক সূরায় কওমে লুতের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা হজরত লুত (আ.)-কে তাঁর সম্প্রদায়ের কাছে পাঠিয়েছিলেন। তিনি তাদের আল্লাহকে ভয় করতে এবং অশ্লীলতা ও সীমালঙ্ঘন থেকে বিরত থাকতে আহ্বান জানান।সুরা আল-আ'রাফের ৮০–৮১ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, হজরত লুত (আ.) তাঁর সম্প্রদায়কে এমন অশ্লীল কাজ থেকে বিরত থাকতে বলেছিলেন, যা তাদের আগে বিশ্বজগতের কেউ করেনি বলে আয়াতে উল্লেখ রয়েছে। সুরা আল-আনকাবুতের ২৯ নম্বর আয়াতে তাদের পথরোধ, রাহাজানি ও সভা-সমাবেশে নিন্দনীয় কাজের কথাও এসেছে।কিন্তু উপদেশ গ্রহণের পরিবর্তে তারা হজরত লুত (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের জনপদ থেকে বের করে দেওয়ার দাবি জানায় (সুরা আল-আ'রাফ: ৮২)। তাদের এই আচরণ ছিল সতর্কবার্তা প্রত্যাখ্যান ও অবাধ্যতার প্রকাশ।আল্লাহর শাস্তি: এক ভয়াবহ পরিণতিকোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, আল্লাহর প্রেরিত ফেরেশতারা হজরত লুত (আ.)-এর কাছে এলে তাঁর সম্প্রদায়ের লোকেরা তাঁদের প্রতি অসৎ উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসে। লুত (আ.) তাদের আল্লাহকে ভয় করতে এবং অতিথিদের ব্যাপারে তাঁকে অপমানিত না করতে বলেন। কিন্তু তারা তাঁর উপদেশ প্রত্যাখ্যান করে।অবশেষে আল্লাহর নির্দেশে তাদের ওপর শাস্তি নেমে আসে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, আল্লাহর নির্দেশ এসে গেলে তিনি সেই জনপদকে উল্টে দেন এবং তাদের ওপর স্তরে স্তরে পোড়ামাটির পাথর বর্ষণ করেন (সুরা হুদ: ৮২–৮৩)। সুরা আল-কামারের ৩৩–৩৯ নম্বর আয়াতেও তাদের সতর্কবার্তা প্রত্যাখ্যান ও শাস্তির বিবরণ রয়েছে।কোরআনে বর্ণিত এ ঘটনা মানুষের জন্য একটি সতর্কবার্তা—অন্যায়, সীমালঙ্ঘন ও আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করার পরিণতি সম্পর্কে চিন্তা করার আহ্বান।হাদিসের শিক্ষা: দায়িত্ব ও জবাবদিহিরাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস ৮৯৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৮২৯)এই শিক্ষা পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ—সবার জন্য প্রযোজ্য। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাদের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে শোনা এবং নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া দায়িত্বেরই অংশ।আজকের সমাজের জন্য সতর্কবার্তাসম্প্রতি প্রথম আলো, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও দ্য ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট তদন্তের খবর উঠে এসেছে। এসব প্রতিবেদনের মধ্যে ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ প্রথম আলোয় প্রকাশিত শিশু ধর্ষণসংক্রান্ত মামলা বৃদ্ধির প্রতিবেদন এবং সাভারে এক শিশুর ওপর যৌন নির্যাতনের অভিযোগসংক্রান্ত প্রতিবেদন উল্লেখযোগ্য। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ দ্য ডেইলি স্টার ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছয় বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনা নিয়েও প্রতিবেদন প্রকাশ করে।এ ধরনের ঘটনায় অভিযোগ ও আদালতে প্রমাণিত অপরাধের মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি। তবে এসব সংবাদ শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে আসে।এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন: কওমে লুতের ঘটনা এবং আধুনিক আইনে ধর্ষণ বা শিশু যৌন নির্যাতনের সংজ্ঞা এক নয়। কোরআনে কওমে লুতের নির্দিষ্ট আচরণ, সীমালঙ্ঘন ও অবাধ্যতার আলোচনা রয়েছে। অন্যদিকে, ধর্ষণ ও শিশু যৌন নির্যাতন হলো মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদার গুরুতর লঙ্ঘন। তাই দুই বিষয়কে অভিন্ন না করে নৈতিক দায়িত্ব, অন্যায়ের প্রতিরোধ এবং জবাবদিহির শিক্ষার জায়গা থেকে আলোচনা করা অধিক যুক্তিসংগত।শিশুদের নিরাপত্তায় পরিবারে সচেতনতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইন অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার অজুহাতে অভিযোগ উপেক্ষা করা কিংবা ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করা গ্রহণযোগ্য নয়।শেষকথাকওমে লুতের ভয়াবহ পরিণতি পবিত্র কোরআনে অবাধ্যতা ও সীমালঙ্ঘনের পরিণতি সম্পর্কে একটি কঠোর সতর্কবার্তা। এই ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণের অর্থ শুধু অতীতের ঘটনা স্মরণ করা নয়; বরং বর্তমান সমাজে অন্যায় প্রতিরোধ, মানুষের মর্যাদা রক্ষা এবং নিজের দায়িত্ব পালনে সচেতন হওয়া।ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটবে তখনই, যখন আমরা দুর্বল ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াব, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করব এবং অপরাধের বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত অবস্থান নেব। কোরআনের শিক্ষা, হাদিসের দায়িত্ববোধ ও আইনের শাসনের সমন্বিত চর্চাই পারে একটি নিরাপদ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে।তথ্যসূত্র:১. পবিত্র কোরআন: সুরা আল-আ'রাফ ৭:৮০–৮৪; সুরা হুদ ১১:৭৭–৮৩; সুরা আল-আনকাবুত ২৯:২৮–৩৫; সুরা আল-কামার ৫৪:৩৩–৩৯।২. সহিহ বুখারি, হাদিস ৮৯৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস ১৮২৯।৩. প্রথম আলো, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬: শিশু ধর্ষণসংক্রান্ত মামলা বৃদ্ধি এবং সাভারে শিশু নির্যাতনের অভিযোগবিষয়ক প্রতিবেদন।৪. দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬: সাভারে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগসংক্রান্ত প্রতিবেদন।
৫. দ্য ডেইলি স্টার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬: ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছয় বছর বয়সী শিশুর মৃত্যু ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগসংক্রান্ত প্রতিবেদন।লেখক: শাহ নেওয়াজ নিজাম
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত