প্রিন্ট এর তারিখ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৩ অক্টোবর ২০২৬
তথ্য জানার অধিকার: অনুকম্পা নয়, সুশাসনের শর্ত
ফারহানা মীম ||
গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার উৎস জনগণ। রাষ্ট্র পরিচালনা, উন্নয়ন পরিকল্পনা, সরকারি ব্যয় কিংবা জনসেবা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই জনগণের স্বার্থ জড়িত। অথচ এসব কার্যক্রম সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে নাগরিকদের অনেক সময় নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সরকারি প্রকল্পে কত টাকা বরাদ্দ হলো, স্থানীয় উন্নয়নকাজে কত ব্যয় হচ্ছে, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধাভোগী নির্বাচনের নিয়ম কী—এসব প্রশ্নের উত্তর জানা নাগরিকের স্বাভাবিক অধিকার। কিন্তু বাস্তবে সেই তথ্য কতটা সহজে পাওয়া যায়? যে তথ্য জনগণের জানার কথা, তা জানতে বারবার আবেদন করতে হবে কেন?একজন দিনমজুর, রিকশাচালক কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখেন। শ্রমের মাধ্যমে অর্থনীতিকে সচল রাখা থেকে শুরু করে পণ্য ও সেবা কেনার সময় কর প্রদান—বিভিন্নভাবে তাঁরা রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের অংশীদার। সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প ও জনসেবার অর্থায়নেও জনগণের অবদান রয়েছে। ফলে সেই অর্থ কোথায়, কীভাবে এবং কতটা কার্যকরভাবে ব্যয় হচ্ছে, তা জানার অধিকার তাঁদের রয়েছে। তথ্যপ্রাপ্তি কোনো বিশেষ সুবিধা নয়; এটি নাগরিকের অধিকার এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করার অন্যতম শর্ত।বাংলাদেশে এই অধিকার নিশ্চিত করার জন্য রয়েছে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯। আইনটির উদ্দেশ্য তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা, সরকারি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো এবং দুর্নীতি প্রতিরোধের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করা। আইনের চতুর্থ ধারায় প্রত্যেক নাগরিকের তথ্য লাভের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। ষষ্ঠ ধারায় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত, কার্যক্রম ও কর্মকাণ্ডের তথ্য সহজলভ্য করে প্রকাশ ও প্রচারের বিধান রয়েছে। অর্থাৎ, তথ্যপ্রাপ্তি শুধু নাগরিকের আবেদনের ওপর নির্ভরশীল থাকার কথা নয়; জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য নিয়মিতভাবে প্রকাশ করাও কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। তবে আইনের সপ্তম ধারায় নির্দিষ্ট কিছু তথ্য প্রকাশ বা সরবরাহের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।কিন্তু আইন থাকা আর তার সুফল বাস্তবে পাওয়া এক বিষয় নয়। কোনো সরকারি দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রয়োজনীয় তথ্য হালনাগাদ না থাকলে, প্রকাশিত নথি সহজে খুঁজে পাওয়া না গেলে কিংবা জটিল ভাষায় তথ্য উপস্থাপন করা হলে তার ব্যবহারিক মূল্য কমে যায়। একটি ওয়েবসাইট থাকাই যথেষ্ট নয়; সেখানে নির্ভুল, হালনাগাদ ও সহজবোধ্য তথ্য থাকা জরুরি। তথ্য প্রকাশের বিধান কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত না হলে প্রযুক্তির প্রসারও নাগরিকের ভোগান্তি পুরোপুরি কমাতে পারে না।এ ক্ষেত্রে ডিজিটাল বৈষম্যও গুরুত্বপূর্ণ। অনলাইনে তথ্য প্রকাশ করা হলেই তা সবার কাছে সহজলভ্য হয়ে যায় না। সবার ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা কিংবা ডিজিটাল মাধ্যমে তথ্য খোঁজার অভিজ্ঞতা এক নয়। একজন শহুরে শিক্ষিত নাগরিক যে তথ্য সহজে খুঁজে পেতে পারেন, গ্রামের একজন প্রবীণ মানুষ বা সীমিত শিক্ষার অধিকারী নাগরিকের জন্য তা কঠিন হতে পারে। আবার তথ্য দীর্ঘ নথির মধ্যে অস্পষ্ট ভাষায় বা অসম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করা হলে সাধারণ মানুষের পক্ষে তা বোঝা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। তাই তথ্য প্রকাশের পাশাপাশি সেটিকে সহজবোধ্য ও ব্যবহারযোগ্য করে তোলাও জরুরি।ধরা যাক, কোনো এলাকার সড়ক নির্মাণ বা সংস্কারের জন্য সরকারি অর্থ বরাদ্দ হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানতে চান, প্রকল্পটির মোট ব্যয় কত, কাজ শেষ হওয়ার সময়সীমা কী এবং কাজের মান যাচাইয়ের দায়িত্ব কার। এসব তথ্য সহজে পাওয়া গেলে তাঁরা উন্নয়নকাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন এবং অনিয়মের আশঙ্কা দেখা দিলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন। একইভাবে, বয়স্ক ভাতা বা অন্য কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির যোগ্যতা, আবেদনপ্রক্রিয়া ও সুবিধাভোগী নির্বাচনের নিয়ম স্পষ্টভাবে প্রকাশিত থাকলে বিভ্রান্তি কমে এবং সেবা প্রদানে স্বচ্ছতা বাড়ে।তথ্যের সঙ্গে নাগরিকের মর্যাদা ও ক্ষমতায়নের সম্পর্কও গভীর। কোনো ব্যক্তি যদি না জানেন, একটি সরকারি সেবা পেতে তাঁর কী যোগ্যতা প্রয়োজন, কোথায় আবেদন করতে হবে কিংবা আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে কোথায় প্রতিকার চাইতে হবে, তাহলে নিজের অধিকার প্রয়োগের সুযোগ থেকেও তিনি পিছিয়ে পড়েন। বিপরীতে, নিয়ম ও সিদ্ধান্তের তথ্য সহজে পাওয়া গেলে নাগরিক নিজের অবস্থান বুঝতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারেন। বিশেষ করে আর্থিক, সামাজিক বা শিক্ষাগত সীমাবদ্ধতার কারণে যাঁরা সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ করতে পারেন না, তাঁদের জন্য তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ আরও গুরুত্বপূর্ণ।তথ্য সংগ্রহে নাগরিকের সময়, অর্থ ও শ্রমের ব্যয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। একজন কর্মজীবী মানুষ বা প্রান্তিক পরিবারের সদস্যের পক্ষে বারবার সরকারি দপ্তরে যাওয়া কিংবা জটিল আবেদনপ্রক্রিয়া অনুসরণ করা সব সময় সহজ নয়। কেউ আইন সম্পর্কে জানেন না, কেউ জানলেও কোথায় আবেদন করতে হবে তা বোঝেন না। ফলে অধিকার আইনে স্বীকৃত হলেও তার সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায় না।তথ্য অধিকার আইনে তথ্য সরবরাহের নির্দিষ্ট সময়সীমা রাখা হয়েছে। সাধারণ ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে অনুরোধ পাওয়ার পর অনধিক ২০ কার্যদিবসের মধ্যে তথ্য দেওয়ার বিধান রয়েছে। একাধিক তথ্য প্রদানকারী ইউনিট বা কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট হলে সময়সীমা অনধিক ৩০ কার্যদিবস। নির্ধারিত সময়ে তথ্য না পেলে বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সিদ্ধান্তে সংক্ষুব্ধ হলে আইন অনুযায়ী আপিলের সুযোগ রয়েছে। আপিলেও প্রতিকার না মিললে নির্ধারিত বিধান ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তথ্য কমিশনে অভিযোগ জানানো যায়।তবে আইনি প্রতিকারের সুযোগ থাকাই যথেষ্ট নয়। নাগরিককে আবেদন করার পদ্ধতি জানতে হবে, নির্ধারিত সময়সীমা বুঝতে হবে এবং প্রয়োজনে আপিল বা অভিযোগ করার সামর্থ্য থাকতে হবে। এসব প্রক্রিয়া সম্পর্কে সচেতনতার অভাব ও সময় ব্যয়ের কারণে অনেকেই অধিকার প্রয়োগে পিছিয়ে পড়তে পারেন। তাই প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থা সহজবোধ্য ও কার্যকর করার পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য প্রকাশের মানসিকতাতেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার মধ্যে ভারসাম্য রাখাও জরুরি। জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সরকারি সিদ্ধান্ত, ব্যয় ও কার্যক্রম সম্পর্কে নাগরিকের জানার অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে, আইন দ্বারা সুরক্ষিত ব্যক্তিগত তথ্য এবং নির্দিষ্ট সংবেদনশীল তথ্যের ক্ষেত্রে যথাযথ সীমাবদ্ধতা থাকা প্রয়োজন। তবে তথ্য গোপন রাখার ক্ষেত্রে আইনসম্মত ভিত্তি থাকতে হবে; গোপনীয়তার বিধান যেন জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য আটকে রাখার অজুহাত হয়ে না ওঠে।প্রকৃত সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে আবেদননির্ভর তথ্য সরবরাহের পাশাপাশি স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারি দপ্তরের ওয়েবসাইট ও ডিজিটাল তথ্যভান্ডার নিয়মিত হালনাগাদ, সহজবোধ্য এবং সবার জন্য ব্যবহারযোগ্য করতে হবে, যাতে সাধারণ তথ্যের জন্য নাগরিককে বারবার আবেদন করতে না হয়। পাশাপাশি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং অনলাইনে তথ্য পেতে অসুবিধায় পড়া মানুষের জন্য সরাসরি তথ্যসেবার ব্যবস্থা রাখা জরুরি।তথ্য চাওয়াকে নাগরিকের অনুগ্রহপ্রার্থনা হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহি দাবি করার অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তথ্যপ্রাপ্তি সহজ হলে নাগরিকের অংশগ্রহণ বাড়ে, সরকারি কার্যক্রমের ওপর জনসাধারণের নজরদারি শক্তিশালী হয় এবং সুশাসনের ভিত্তি দৃঢ় হয়। শুধু আইন প্রণয়ন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; সেই আইন যেন সাধারণ মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনে, তা নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তথ্য জানার অধিকার কোনো অনুকম্পা নয়; এটি নাগরিকের অধিকার এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনের অন্যতম শর্ত।লেখক: ফারহানা মীম,শিক্ষার্থী,গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ,বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত