প্রিন্ট এর তারিখ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬
নিরাপদ আবাসন দারিদ্র্য বিমোচনের নতুন সম্ভাবনা
ড. একেএম নুরুজ্জামান ||
নিরাপদ আবাসন শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই নয়, বরং দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার অন্যতম ভিত্তি। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও নদীভাঙনের মতো দুর্যোগে বাংলাদেশের নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো প্রতিনিয়ত ক্ষতির মুখে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে সহজ শর্তে আবাসন ঋণ এবং জলবায়ু-সহনশীল ঘর নির্মাণের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)।আবাসন ঋণে স্বল্প আয়ের মানুষের সুযোগবাংলাদেশে নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসন ঋণের চাহিদা থাকলেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সাধারণত ছোট অঙ্কের ঋণ দিতে আগ্রহী নয়। ঋণের ঝুঁকি, কম মুনাফা এবং জমির দলিল ও বন্ধকের শর্তের কারণে অনেক দরিদ্র পরিবার প্রাতিষ্ঠানিক ঋণসুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে নিজেদের সীমিত সঞ্চয় দিয়ে ঘর নির্মাণ করতে গিয়ে অনেক সময় দুর্বল ও অসম্পূর্ণ ঘরে বসবাস করতে হয় তাদের।এই সংকট মোকাবিলায় পিকেএসএফ সহজ শর্তে, বন্ধক ছাড়াই এবং তুলনামূলক দীর্ঘ মেয়াদে আবাসন ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এর লক্ষ্য নিরাপদ বাসস্থানের পাশাপাশি দরিদ্র পরিবারের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রথম উদ্যোগ২০১৬ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে শুরু হয় ‘লো-ইনকাম কমিউনিটি হাউজিং সাপোর্ট প্রজেক্ট’ (এলআইসিএইচএসপি)। সাতটি সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে দেশের ১৩টি শহরে এ প্রকল্পের আওতায় আবাসন ঋণ দেওয়া হয়।২০২১ সালের মে মাস পর্যন্ত ১২ হাজার ২ জন সদস্যকে মোট ২৫৫ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ৫৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ ঋণ পেয়েছে মাসিক ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করা পরিবারগুলো। প্রকল্পটির ক্ষেত্রে লক্ষ্য ছিল ৪০ শতাংশ।প্রকল্পের আওতায় ঋণ নিয়ে অনেক পরিবার ঘর নির্মাণ ও সংস্কারের পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিশুদের পড়াশোনার পরিবেশ এবং সামাজিক মর্যাদার উন্নতি ঘটাতে পেরেছে। কিছু পরিবারের জন্য ছোট ব্যবসার সুযোগও তৈরি হয়েছে।৪২ জেলায় আবাসন ঋণ কর্মসূচিপ্রথম প্রকল্পের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ২০১৯ সালে নিজস্ব তহবিলে আবাসন ঋণ কর্মসূচি চালু করে পিকেএসএফ। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৪২টি জেলার ১৬০টি উপজেলায় ৩২টি সহযোগী সংস্থার ৩৬০টি শাখার মাধ্যমে কর্মসূচিটি পরিচালিত হচ্ছে।এ পর্যন্ত ৫২ হাজার ১৮৪টি পরিবারকে ঋণ দেওয়া হয়েছে। ঋণ বিতরণের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা। এই অর্থ দিয়ে কেউ নতুন ঘর নির্মাণ করেছেন, কেউ পুরোনো ঘর সংস্কার করেছেন, আবার কেউ বাড়ির পরিসর বাড়িয়েছেন।এর ফলে অনেক বাড়িতে আলো-বাতাস চলাচল, স্যানিটেশন, রান্নাঘর ও বসবাসের পরিবেশের উন্নতি ঘটেছে।জলবায়ু-সহনশীল ঘর নির্মাণে বিশেষ উদ্যোগবাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততা এবং উত্তরাঞ্চলে বন্যা ও নদীভাঙন আবাসনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। এসব এলাকায় সাধারণ ঘরের পরিবর্তে দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষম বাসস্থান নির্মাণ জরুরি হয়ে উঠেছে।গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ডের (জিসিএফ) অর্থায়নে পিকেএসএফ বাস্তবায়ন করছে ‘রেজিলিয়েন্ট হোমস্টেড অ্যান্ড লাইভলিহুড সাপোর্ট টু দ্য ভালনারেবল কোস্টাল পিপল অব বাংলাদেশ’ (আরএইচএল) প্রকল্প। খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা ও কক্সবাজারের ২১টি উপজেলায় ১৮টি সহযোগী সংস্থার মাধ্যমে প্রকল্পটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।প্রকল্পের লক্ষ্য ৩ হাজার বসতভিটা উন্নয়ন। এসব বাড়িতে উঁচু ভিটা, শক্ত কাঠামো, নিরাপদ স্যানিটেশন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা, সৌরবিদ্যুৎ ও উন্নত চুলা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি ঝড়ের ঝুঁকি কমাতে বাড়ির চারপাশে গাছ লাগানো হচ্ছে। এরই মধ্যে ২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি গাছ লাগানো হয়েছে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টিনিরাপদ ঘর নির্মাণের পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরিতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। উঁচু মাচায় ছাগল-ভেড়া পালন, লবণসহিষ্ণু সবজি চাষ, বস্তায় আদা চাষ এবং কাঁকড়া চাষে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।প্রকাশিত নিবন্ধের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৬ হাজার ১৮৮ জন আদা চাষি প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা আয় করেছেন। এসব উদ্যোগ দুর্যোগের সময় জীবিকা হারানোর ঝুঁকি কমাতে এবং পরিবারের আয় বাড়াতে সহায়ক হচ্ছে।উত্তরাঞ্চলে বন্যা মোকাবিলায় উঁচু ভিটাউত্তরাঞ্চলের বন্যাপ্রবণ এলাকাগুলোতে উঁচু ভিটা নির্মাণের মাধ্যমে আবাসন সুরক্ষায় কাজ করেছে ইসিসিসিপি-ফ্লাড প্রকল্প। গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড ও পিকেএসএফের মোট ১৩ দশমিক ৩৩ মিলিয়ন ডলারের এ প্রকল্প কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা ও জামালপুরে পরিচালিত হয়েছে।এ প্রকল্পের আওতায় এলাকার অতীতের সর্বোচ্চ বন্যার পানির উচ্চতার ওপরে ভিটা উঁচু করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ১৫ হাজার ৫৬৩টি ভিটা উন্নয়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থাপন করা হয়েছে নলকূপ ও জলবায়ু-সহনশীল শৌচাগার।এ ছাড়া বন্যা-সহনশীল ধানের বীজ বিতরণ, চরে সবজি চাষের প্রশিক্ষণ এবং ছাগল-ভেড়া পালনের জন্য প্রায় ২ হাজার মাচা-ঘর তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কার্যক্রমে নারীপ্রধান পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একই ধরনের আরেকটি সিসিসি প্রকল্পের আওতায় ৫ হাজার ৭৫৯টি ভিটা উঁচু করা হয়েছে।৪০ হাজার পরিবারকে ঋণ দেওয়ার লক্ষ্যআবাসন ঋণ কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণের মাধ্যমে। এ অর্থায়নে পিকেএসএফ ও সহযোগী সংস্থাগুলোর মাধ্যমে ২০৩১ সালের মধ্যে অন্তত ৪০ হাজার পরিবারকে আবাসন ঋণ দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঋণগ্রহীতাদের অন্তত ৩২ হাজার হবেন নারী এবং অন্তত ২৪ হাজার ঋণগ্রহীতা থাকবেন দুর্যোগপ্রবণ এলাকার বাসিন্দা। ঋণ দেওয়া হবে বন্ধক ছাড়াই এবং দীর্ঘমেয়াদি শর্তে। নারীর আবাসন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্বামী-স্ত্রীর যৌথ উদ্যোগকেও উৎসাহিত করা হবে।দারিদ্র্য কমাতে আবাসনের গুরুত্বপিকেএসএফের বিশ্লেষণে আবাসনকে দারিদ্র্য বিমোচনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। নিরাপদ ঘর পরিবারের সামাজিক পরিচিতি ও মর্যাদা বাড়ায়, নারীর ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখে এবং শিশুদের পড়াশোনার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো, সম্পদ গড়ে তোলা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও সহায়তা করে।অনেক পরিবার নিজেদের ঘরেই সেলাই, হাঁস-মুরগি পালন কিংবা ছোট দোকানের মতো আয়মূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। ফলে আবাসন শুধু বসবাসের জায়গা নয়, অনেক ক্ষেত্রে জীবিকা নির্বাহেরও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।তবে এ খাতে এখনো নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। চাহিদার তুলনায় তহবিলের সীমাবদ্ধতা, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন। এ জন্য সরকার, উন্নয়ন সহযোগী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।নিরাপদ ও জলবায়ু-সহনশীল আবাসন নিশ্চিত করা গেলে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো শুধু একটি স্থায়ী আশ্রয়ই পাবে না, বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার মাধ্যমে দারিদ্র্যের চক্র থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগও পাবে।লেখক: ড. একেএম নুরুজ্জামান, সিনিয়র মহাব্যবস্থাপক, পিকেএসএফপরিবর্তন সংবাদ/এসআর
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত