প্রিন্ট এর তারিখ : ১৬ অক্টোবর ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৬ অক্টোবর ২০২৬
প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে সচিবালয়ে রাত কাটাচ্ছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে আগের পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার পর এবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। নতুন করে নির্ধারিত নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে সচিবালয়ে রাত কাটাচ্ছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক। প্রশ্নপত্র তৈরি থেকে শুরু করে পরীক্ষাকেন্দ্রে পাঠানোর আগপর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় নজরদারি রাখছেন তিনি।শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ১১তম গ্রেডের ২৪২টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছেন প্রায় ৩ লাখ ১৯ হাজার প্রার্থী। বিপুলসংখ্যক চাকরিপ্রার্থীর এই পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তায় বিশেষ নজরদারিসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার রাতেও সচিবালয়ে প্রশ্নপত্র তৈরির কাজ চলছিল। প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের পাশাপাশি সেখানে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রণালয় ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।প্রশ্নপত্র যাতে কোনোভাবেই ফাঁস না হয়, সে জন্য পরীক্ষাকেন্দ্রে পাঠানোর আগপর্যন্ত সচিবালয়ে অবস্থান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী। প্রয়োজনে নিজের দপ্তরেই বিশ্রাম নেবেন তিনি।প্রশ্নপত্র প্রণয়নের কাজ তদারকিতে মন্ত্রণালয়ের সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ নিয়োগ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারাও দায়িত্ব পালন করছেন।পরীক্ষাকেন্দ্রে থাকবে বাড়তি নিরাপত্তানিয়োগ পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে এবার একাধিক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পরীক্ষার দায়িত্ব পালনের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ১৯ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে।পরিকল্পনা অনুযায়ী, পরীক্ষা শুরুর এক ঘণ্টা আগে পুলিশি পাহারায় পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোতে প্রশ্নপত্র পাঠানো হবে। রাজধানীর বৃহত্তর মিরপুর এলাকার শতাধিক কেন্দ্রে পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। পাশাপাশি প্রশ্নপত্র তৈরি ও ছাপানোর স্থানও পরিবর্তন করা হয়েছে।কর্তৃপক্ষের এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা রক্ষা এবং পরীক্ষার নির্ধারিত সময় পর্যন্ত নিরাপত্তা বজায় রাখা।আগের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগএর আগে গত ১০ অক্টোবর নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা শুরুর আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে পড়ে। মূল প্রশ্নপত্রের সঙ্গে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের মিল পাওয়ার পর পরীক্ষা স্থগিত করা হয়।এ ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন চাকরিপ্রার্থীরা। অনেকেই দূরদূরান্ত থেকে ঢাকায় এসে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছানোর পর পরীক্ষা স্থগিতের খবর পান। আকস্মিক সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ প্রার্থীরা রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেন।একটি নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি, যাতায়াতের খরচ ও সময় ব্যয়ের পর শেষ মুহূর্তে পরীক্ষা স্থগিত হওয়ায় প্রার্থীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়।তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটিপ্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মাহফুজুল আলম খানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।প্রাথমিকভাবে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও পরে তদন্তের সময় বাড়ানো হয়। প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক জানিয়েছেন, তদন্ত কমিটিকে রোববার পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে।প্রশ্নপত্র তৈরি, ছাপানো ও ফটোকপির কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের অংশ হিসেবে সিআইডির ফরেনসিক দলও আলামত সংগ্রহ করেছে।প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসে মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তা কিংবা বাইরের কেউ জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে আগের পরীক্ষায় ভোগান্তির শিকার প্রার্থীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন তিনি।প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ছয়জন গ্রেপ্তারএদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। বৃহস্পতিবার রাতে এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন গ্রেপ্তারের তথ্য জানান।গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে বিপুলসংখ্যক প্রবেশপত্র, স্ট্যাম্প ও ব্যাংক চেক উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাতে শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবির মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করার কথা রয়েছে।তদন্তের মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন এবং কীভাবে প্রশ্নপত্র বাইরে ছড়িয়ে পড়েছিল, তা আরও স্পষ্ট হওয়ার কথা।স্বচ্ছ নিয়োগ পরীক্ষার অপেক্ষায় চাকরিপ্রার্থীরাপ্রায় ৩ লাখ ১৯ হাজার আবেদনকারীর বিপরীতে মাত্র ২৪২টি পদ। এমন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা চাকরিপ্রার্থীদের আস্থার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। তাই এবার নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের শনাক্ত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।সচিবালয়ে প্রতিমন্ত্রীর অবস্থান, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ, পুলিশি পাহারায় প্রশ্নপত্র পরিবহন এবং প্রশ্নপত্র তৈরির স্থান পরিবর্তন—সব মিলিয়ে এবার বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হয়েছে।এখন দেখার বিষয়, এসব ব্যবস্থা প্রশ্নপত্র ফাঁস প্রতিরোধে কতটা কার্যকর হয় এবং আগের ঘটনার তদন্তে দায়ীদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। চাকরিপ্রার্থীদের প্রত্যাশা, নিয়োগ পরীক্ষা হবে স্বচ্ছ, সুষ্ঠু ও প্রশ্নফাঁসমুক্ত পরিবেশে।
কপিরাইট © ২০২৬ । সর্বস্ব সংরক্ষিত