বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে একটি চেনা দৃশ্য প্রায় প্রতি নির্বাচনের আগেই চোখে পড়ে—বড় রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী প্রচারণার সূচনা হয় সিলেট থেকে। বিএনপি হোক কিংবা আওয়ামী লীগ, অতীতের প্রায় সব জাতীয় নির্বাচনে এই অঞ্চলের নামই উঠে এসেছে প্রচারণার প্রথম অধ্যায়ে। এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। প্রশ্ন হলো, কেন বারবার সিলেটই হয়ে ওঠে নির্বাচনী যাত্রার সূচনাবিন্দু?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও দলীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এর পেছনে রয়েছে ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, ধর্মীয় বিশ্বাস, প্রতীকী রাজনীতি ও কৌশলগত হিসাব—এই চারটির সমন্বয়।
প্রথমত, ঐতিহ্য ও রাজনৈতিক রেওয়াজ। স্বাধীনতার পর থেকেই জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অনেক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে সিলেটকে কেন্দ্র করে। বিএনপির রাজনীতিতে এই রেওয়াজ আরও গভীরভাবে প্রোথিত। দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তার সময় থেকেই সিলেটকে নির্বাচনী প্রচারণার গুরুত্বপূর্ণ সূচনাস্থল হিসেবে বিবেচনা করতেন। পরে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও ১৯৯১ সালের পর থেকে প্রতিটি নির্বাচনে সিলেট থেকেই প্রচারণা শুরু করেন। দীর্ঘদিন ধরে এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকায় বিষয়টি এখন দলীয় সংস্কৃতির অংশে পরিণত হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, সিলেটের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব। হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজারকে কেন্দ্র করে সিলেটকে দেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী বলা হয়। রাজনীতিতে ধর্মীয় আবেগের প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অনেক রাজনৈতিক নেতা মনে করেন, নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতে এই পুণ্যভূমিতে মাজার জিয়ারত করলে তা শুভ সূচনা হিসেবে বিবেচিত হয় এবং সাধারণ মানুষের মাঝেও ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে যায়।
তৃতীয় কারণটি প্রতীকী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। সিলেট থেকে প্রচারণা শুরুর মাধ্যমে দলগুলো জাতীয় পর্যায়ে একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চায়—নির্বাচনের লড়াই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে গেছে। গণমাধ্যমের নজর সহজেই এই কর্মসূচির দিকে পড়ে, ফলে প্রথম দিনেই দেশব্যাপী আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসা সম্ভব হয়।
চতুর্থ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রবাসী ভোট ও প্রভাব। সিলেট অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষ যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাস করেন। তারা সরাসরি ভোট না দিলেও অর্থনৈতিক সহায়তা, রাজনৈতিক মতামত ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের কারণে দলগুলোর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিলেট থেকে প্রচারণা শুরু করলে সেই বার্তা প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছেও দ্রুত পৌঁছে যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সিলেটকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত আবেগ ও কৌশলের এক ধরনের মেলবন্ধন। এটি কেবল একটি শহর নয়, বরং একটি রাজনৈতিক প্রতীক—যার মাধ্যমে দলগুলো তাদের নির্বাচনী যাত্রার শক্ত বার্তা দিতে চায়।
এই ঐতিহ্য ও প্রতীকী গুরুত্বকে সামনে রেখেই বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবারের নির্বাচনী প্রচারণা সিলেট থেকে শুরু করছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। দীর্ঘ ২১ বছর পর বুধবার (২১ জানুয়ারি) সিলেটের মাটিতে পা রেখে তিনি হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) বিকেল ৩টায় সিলেট নগরের আলিয়া মাদরাসা মাঠে জেলা ও মহানগর বিএনপির আয়োজিত সমাবেশের মাধ্যমে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করবেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দলীয় দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই তার প্রথম সিলেট সফর এবং নির্বাচনী প্রচারণায় প্রথমবারের মতো সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার ঘটনা।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ঐতিহ্য, ধর্মীয় বিশ্বাস, রাজনৈতিক প্রতীক এবং কৌশলগত সুবিধা—এই চার কারণেই সিলেট বারবার বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনী রাজনীতির সূচনাস্থল হয়ে উঠেছে।

আপনার মতামত লিখুন :