ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও একইদিনের গণভোটকে সামনে রেখে আজ বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে নির্বাচনি প্রচারণা। বুধবার দিনভর প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ সম্পন্ন হওয়ায় নির্বাচন আরও এক ধাপ এগিয়ে গেল। এর মধ্য দিয়ে ভোটের মাঠে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামছেন প্রায় দুই হাজার প্রার্থী। প্রচারণা শুরু ঘিরে রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের তৎপরতাও বাড়তে শুরু করেছে।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, ২২ জানুয়ারি থেকে প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে গিয়ে সরাসরি ভোট চাইতে পারবেন। ইতোমধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল পোস্টার ও লিফলেট ছাড়াই বিকল্প প্রচারণা কৌশল নির্ধারণ করেছে। প্রতীক বরাদ্দ পাওয়ার পর আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনের আশপাশে কয়েকটি দলের নেতাকর্মীদের সংক্ষিপ্ত মিছিল করতেও দেখা যায়।
ভোটের লড়াইয়ে প্রায় দুই হাজার প্রার্থী
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবারের সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন ৩ হাজার ৪১৭ জন সম্ভাব্য প্রার্থী। তাদের মধ্যে ২ হাজার ৫৮০ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। যাচাই-বাছাই ও আপিল প্রক্রিয়া শেষে ৪৩৬ জন প্রার্থী তাদের প্রার্থিতা ফিরে পান। পরবর্তীতে বিভিন্ন দল থেকে ৩০৫ জন প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। সব মিলিয়ে চূড়ান্তভাবে ভোটের মাঠে থাকছেন ১ হাজার ৯৭২ জন প্রার্থী।
সীমানা জটিলতার কারণে পাবনা-১ ও পাবনা-২ আসনের নির্বাচন কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত হলেও পরে নতুন তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। ওই দুই আসনে বৈধ ঘোষিত ৯ জন প্রার্থী যুক্ত হওয়ায় ৩০০ আসনে প্রার্থীর সংখ্যা আরও বাড়বে বলে জানিয়েছে ইসি।
প্রচারণায় মানতে হবে আচরণবিধি
নির্বাচনি প্রচারণার ক্ষেত্রে এবার কঠোর আচরণবিধি কার্যকর করেছে নির্বাচন কমিশন। প্রথমবারের মতো পোস্টার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি পলিথিন ও রেকসিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করে পরিবেশবান্ধব প্রচারসামগ্রী ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে তফসিল ঘোষণার পরও বিভিন্ন এলাকায় পোস্টার দেখা যাওয়ায় কমিশন কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন আগেই সতর্ক করে বলেছিলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কমিশন কোনও ধরনের ছাড় দেবে না। নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহও জানিয়েছেন, রিটার্নিং কর্মকর্তারা বিধিভঙ্গের ঘটনায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেবেন।
ঢাকা-১৫ ও ঢাকা-১৩ আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. ইউনুচ আলী প্রার্থীদের উদ্দেশে বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায় সরাসরি প্রার্থীকেই নিতে হবে। কর্মীদের কর্মকাণ্ডের দায়ও প্রার্থীর ওপর বর্তাবে।
প্রচারণায় যা করা যাবে
ইসির নির্দেশনা অনুযায়ী, জনসভা ও সমাবেশ আয়োজনের ক্ষেত্রে অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানাতে হবে। সড়ক, মহাসড়ক ও জনপথে জনসভা বা পথসভা আয়োজন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন, যার আকার নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকতে হবে। ব্যানার, ফেস্টুন ও লিফলেট শুধুমাত্র সাদা-কালো রঙে ছাপানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। প্রার্থীর নিজের ছবি ও প্রতীক ছাড়া অন্য কারও ছবি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। দলীয় প্রার্থীরা কেবল দলীয় প্রধানের ছবি ব্যবহার করতে পারবেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচারণার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে প্রচার শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট ফেসবুক পেজ, ইউটিউব চ্যানেল বা অ্যাকাউন্টের বিস্তারিত তথ্য রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে হবে।
কঠোর শাস্তির বিধান
সংশোধিত আচরণবিধি অনুযায়ী, বিধি লঙ্ঘনের দায়ে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড বা দেড় লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেও এক লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। গুরুতর অপরাধে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও রাখা হয়েছে নির্বাচন কমিশনের হাতে।
ভোটার ও ভোটকেন্দ্রের তথ্য
এবার দেশের মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ১৪ হাজার ৯০৭ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ১ হাজার ২৩৪ জন।
সারা দেশে মোট ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্র স্থাপনের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। একই দিনে গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় গোপন বুথের সংখ্যা বাড়ানো হবে।

আপনার মতামত লিখুন :