ঢাকা রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
অদৃশ্য নির্বাচনি খরচে বিপাকে ব্যবসায়ীরা

প্রশ্নের মুখে রাজনৈতিক অর্থায়নের সংস্কৃতি

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ জানুয়ারী, ২০২৬, ১০:৪৮ দুপুর

ছবি: সংগৃহীত

নির্বাচন এলেই দেশের ব্যবসায়ী সমাজের ওপর যে অদৃশ্য অথচ গভীর চাপ নেমে আসে, তা দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের প্রকাশ্য গোপন বাস্তবতা হিসেবে বিদ্যমান। তবে এবারের নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক অর্থায়নের অস্বচ্ছ ও অনৈতিক চর্চা নতুন করে তীব্র আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। শিল্প খাতের শীর্ষ এক নেতার সরাসরি বক্তব্য সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

একটি টেলিভিশন টকশোতে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল অভিযোগ করেন, সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীদের পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের কাছে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হচ্ছে। তার এই বক্তব্য ব্যবসায়ী মহলের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।

শওকত আজিজ রাসেল বলেন, এমপি প্রার্থীদের পক্ষ থেকে এ ধরনের অর্থ দাবি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং এটি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তার ভাষায়, ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের এমনিতেই নানামুখী চাপ মোকাবিলা করতে হয়, অনেক সময় বাস্তবতার কারণে আপস করতে হয়। কিন্তু নির্বাচনের নামে চাঁদাবাজি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যাকে আর স্বাভাবিক বলা যায় না।

নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনায় তিনি বলেন, সম্প্রতি এক এমপি প্রার্থী তাকে ফোন করে সহযোগিতা চান। শুরুতে তিনি একটি সীমার মধ্যে সহায়তার মানসিক প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রার্থী প্রকাশ্যে কোটি টাকার অঙ্ক উল্লেখ করায় তিনি বিস্মিত হন। তার মতে, ফোনালাপের ধরন এমন ছিল, যেন ওই প্রার্থীর তার প্রতিষ্ঠানের ওপর মালিকানাস্বত্ব রয়েছে।

বিটিএমএ সভাপতির দাবি, এ ধরনের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অনেক ব্যবসায়ীই একই ধরনের চাপের মুখে পড়ছেন। তিনি মনে করেন, এই সংস্কৃতি বন্ধ না হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিক পরিবেশ আরও সংকুচিত হয়ে পড়বে।

চাঁদাবাজির সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শওকত আজিজ রাসেল বলেন, কর্মসংস্থানের অভাবে কেউ কেউ চাঁদাবাজিতে জড়ালে তা সামাজিক সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। কিন্তু একজন সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী যদি কোটি টাকা দাবি করেন এবং কম দিলে হুমকির আশ্রয় নেন, তাহলে সেটাকে কোনোভাবেই রাজনৈতিক বাস্তবতার অজুহাতে ব্যাখ্যা করা যায় না।

নাম প্রকাশ না করার বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি ব্যক্তিবিশেষের নাম বলার বিষয় নয়। বরং রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বের উচিত এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া। সব দলের প্রধানদের উচিত ঘোষণা দেওয়া, যাতে এ ধরনের দাবির মুখে পড়লে ব্যবসায়ীরা নির্ভয়ে অভিযোগ জানাতে পারেন।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খান বলেন, অভিযোগে কোনো নির্দিষ্ট দল বা ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে দলের কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এলে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ব্যবসায়ী সমাজের বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরে নিট পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় এমনিতেই অত্যন্ত বেশি। প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় সুবিধা কমে যাওয়ায় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান চাপে রয়েছে। এই অবস্থায় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অবৈধ ও অন্যায্য অতিরিক্ত ব্যয় বহনের সক্ষমতা অধিকাংশ ব্যবসায়ীর নেই।

তিনি স্বীকার করেন, বাস্তব পরিস্থিতিতে কিছু ব্যবসায়ী বাধ্য হয়েই নির্বাচনি প্রার্থীদের সহায়তা করতে বাধ্য হন। তার মতে, কিছু রাজনৈতিক দল নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও অর্থায়নের মাধ্যমে নির্বাচনি ব্যয় মেটাতে পারলেও অনেক দলের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের ওপর নির্ভরতা থেকেই যাচ্ছে।

বিকেএমইএ সভাপতি মনে করেন, প্রতিটি রাজনৈতিক দলের উচিত দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তোলা, যাতে নির্বাচন এলেই ব্যবসায়ী সমাজের ওপর চাপ সৃষ্টি না হয়।

একই সুরে কথা বলেন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল। তিনি বলেন, দেশে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চলেছে। জ্বালানি সংকট, কর ও শুল্কচাপ, প্রশাসনিক জটিলতা এবং পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির মতো সমস্যায় শিল্প খাত ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে অবৈধ ব্যয় বহনের সক্ষমতা ব্যবসায়ীদের নেই।

রাজনৈতিক দিক থেকে বিষয়টি আরও গুরুতর বলে মন্তব্য করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আরিফুর রহমান তুহিন বলেন, চাঁদাবাজির কারণে ইতোমধ্যে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে। তার দাবি, নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি চক্র অনেক আগেই সক্রিয়ভাবে চাঁদা আদায় শুরু করেছে।

তিনি বলেন, চাঁদাবাজির এই সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে তা শুধু নির্বাচন নয়, দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা ও অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠবে।

এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নির্বাচনের সময় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের ঘটনা নতুন নয়। তবে গণঅভ্যুত্থানের পরও এই অনৈতিক চর্চা অব্যাহত থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তার মতে, কোথাও স্বেচ্ছায়, আবার কোথাও জোরপূর্বক অর্থ আদায়—দুটিই সুশাসন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের পরিপন্থী।

Link copied!