ঢাকা শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায়

একজন সফল নারী চিকিৎসক রওশন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৩ জুলাই, ২০২৫, ০৭:১৫ বিকাল

হোমিওপ্যাথি এক উত্তম চিকিৎসা পদ্ধতির নাম; যা মানুষের রোগকে নির্মূল করে। হোমিওপ্যাথির কাজ এত গভীর সত্যিই অবাক হবার মতো। অবশ্য অনেকেই হোমিওপ্যাথিতে আস্থা আনতে পারেননি। তাদের মতে- অনেক চিকিৎসা করেছি কিন্তু হোমিওতে কোনো সুফল পাইনি। এটা স্বাভাবিক। অনেকের হোমিও ওষুধে কোনো কাজই হয়নি। আর এটা হোমিও পদ্ধতি ও ওষুধের জন্য নয়; চিকিৎসকের জন্য। তিনি রোগ সম্পর্কে বুঝতে পারেননি। সঠিক রোগের সঠিক ওষুধ প্রয়োগ হলে রোগ নির্মূল সম্ভব।

 

শতকরা ৭০-৮০ ভাগ রোগী এই চিকিৎসায় সুফল পেয়ে থাকেন বলে দাবি করেন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসকরা। তবে অনেককে দেখেছি হোমিওর মূলনীতি থেকে সরে গিয়ে দুই-একটি বই আয়ত্ত করে চিকিৎসক সেজে বসে আছেন। তারা সঠিক রোগ বা লক্ষণ নির্বাচনেও অক্ষম। তাদের কাছে রোগী গেলে হোমিওপ্যাথির বদনাম হবেই হবে।

এক সময় আমারও আস্থা ছিল না এ পদ্ধতির ওপর। মনে হতো- হোমিও পদ্ধতি একটি প্লাসিবো। রোগীকে এমন ওষুধ বা ব্যবস্থাপনা দেওয়া, যার বাস্তবে রোগের সঙ্গে কোনো সম্পর্কই নেই। শুধুমাত্র মনের জোরেই রোগমুক্তি হয়। তবে হোমিওপ্যাথি যে একটি আরোগ্য বিধান; তা আমি নিজেই উপলব্ধি করেছি। তার একটি ঘটনা সম্পর্কে না বললেই নয়।

বেশ কয়েক বছর আগে মাঝে-মধ্যেই কোমরের ব্যথায় ভুগতাম। কোমর সোজা করতে পারতাম না। অনেক ডাক্তার দেখিয়েছি; পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করিয়েছি। ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী অনেক ব্যথার ওষুধ খেয়েছি। ওষুধ খেলে ভালো থাকি; বন্ধ করলে যা তাই। যৌবনকালেই এ অবস্থা; বৃদ্ধ বয়সে কী হবে- চিন্তাটা পেয়ে বসেছিল তখন। ওই সময় একজন বৃদ্ধ হোমিওপ্যাথি চিকিৎসককে চিনতাম; ভালো সম্পর্কও ছিল তার সঙ্গে। মাঝে মধ্যে আড্ডাও দিতাম তার সঙ্গে। একদিন কোমরের ব্যথার বিষয়টি তাকে জানালাম। তিনি আমাকে দুই ফোটা ওষুধ আমার জিহ্বার দিয়ে বললেন- আর দুদিন কষ্ট করো। তখন হোমিওপ্যাথির ওপর আমার কোনো আস্থা ছিল না। তবু তার অনুরোধ ফেলতে পারিনি।

পরদিন সকালে কোমরের ব্যথা এত বেড়ে গেল যে বিছানা ছেড়ে উঠতেই পারলাম না। বিকালের দিকে কোনোরকমে ওই বৃদ্ধ চিকিৎসকের চেম্বারে গিয়ে তার সঙ্গে খুব রাগারাগি করলাম। তখন তিনি আমাকে আরও দুই ফোটা ওষুধ দিলেন (পরে জেনেছিলাম পরের ওষুধটা ছিল শুধু স্পিরিট। ওই মুহূর্তে আমাকে শান্ত রাখার কৌশল)। দুই দিন পর কোমর ব্যথার বিষয়টি ভুলেই গেলাম; সেই সঙ্গে ভুলে গেলাম সেই বৃদ্ধ চিকিৎসককেও। কারণ আমার কোমরে আর কোনো ব্যথা নেই। এ পর্যন্ত আর সেই ব্যথা হয়নি। অসুখ না থাকলে কেউ চিকিৎসকের খবর রাখে না- সেটাই প্রমাণিত হলো।

এ ঘটনার বেশ কয়েক বছর পর ওই বৃদ্ধ চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা। তখন তার ও তার দেওয়া সেই দুই ফোটা ওষুধের গুণের কথা মনে পড়ল। জানলাম, ভালো চিকিৎসক হলেও তিনি পসার জমাতে পারেননি। কেন পারেননি তা জানি না; তবে তার দুই ফোটা ওষুধে আমি কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়েছি। কষ্টভোগের শিকার না হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার প্রয়োজনও পড়ে না বলে তাকেও আর মনে রাখিনি আমি।

এখন হোমিও চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর আস্থা ফিরেছে। অনেক চিন্তা-ভাবনাও করেছি এ পদ্ধতি নিয়ে; কথা বলেছি এ পদ্ধতির পক্ষে-বিপক্ষের অনেকের সঙ্গে।

 

সম্প্রতি একটি হোমিও কলেজের প্রভাষক ডা.   ফখরুন নাহার রওশন নামে এক নারী  চিকিৎসকের সঙ্গে কথা হয়। কথায় কথায় তিনি জানান, হোমিওপ্যাথিতে ওষুধ অনেক আছে; চিকিৎসক কম।

তিনি বলেন, হোমিওপ্যাথি মূলত এমন একটি বিধান যা ‘সদৃশ সদৃশকে আরোগ্য’ করে। লক্ষণ মিলিয়ে সঠিক ওষুধ প্রয়োগ করলে হোমিওতে রোগ নির্মূল করা সম্ভব। অবশ্য ক্রনিক রোগ নির্মূলে সময় বেশি লাগে বলে রোগীরা অধৈর্য হয়ে পড়েন। বিষয়টি যারা বোঝেন- তারা ধৈর্য ধরে চিকিৎসা নেন। আবার অনেকে মাঝপথে চিকিৎসা ছেড়ে দিয়ে হোমিও বিধানের বদনাম করেন।

 

ডাঃ ফখরুন নাহার রওশন, একজন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক,তিনি কুমিল্লা জেলার নাঙ্গলকোট উপজেলায় বদরপুর গ্রামের ওলামা বাড়ির সন্তান হিসেবেই পরিচিত। তাহার শৈশব কেটেছে বদরপুরেই।



ডাক্তার রওশন ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে দাখিল আলিম ফাজিল কামিল শেষ করেছে। পাশাপাশি হোমিওপ্যাথিতে ডিএইচএমএস কোর্স শেষ করে ২০১৫ সাল থেকে "আহমদ হোমিও মেডিসিন সেন্টার" নামে একটি চেম্বার দিয়ে রোগী দেখা শুরু করেন এবং নাঙ্গলকোট হাজী বাদশা আমেনা হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে প্রভাষক পদে কর্মরত আছেন। এর মাঝে  আরও একটি হোমিওপ্যাথিক উচ্চতর প্রশিক্ষণ কোর্স "পিডিটি" শেষ করে। বর্তমানে একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হসপিটাল ম্যানেজমেন্ট নিয়ে "এম পি এইচ" করছে।

 

ডাঃ ফখরুন নাহার রওশন পিতার ইচ্ছাতেই হোমিওপ্যাথিতে আসেন। পরবর্তীতে এটাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার প্রধান কারণ হিসাবে বলেন, আমি দেখলাম একমাত্র হোমিওপ্যাথিতেই  অসুস্থ মানুষকে প্রকৃত আরোগ্য দেওয়া সম্ভব। হোমিওপ্যাথি একটি বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতি, সদৃশ নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। সুস্থ মানব দেহে ওষুধ পরীক্ষা করে যে লক্ষণ পাওয়া যায়, ঐ লক্ষণযুক্ত রোগীকে সেই ওষুধ প্রয়োগ করে স্থায়ী আরোগ্য দেওয়া যায়।

সবথেকে বড় বিষয় হলো হোমিওপ্যাথিতে কোন রোগের আংশিক বা আঙ্গিক চিকিৎসা দেওয়া হয় না বরং সামগ্রিকভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়, রোগীর বর্তমান কষ্টের পাশাপাশি রোগের কারণ, ইতিহাস, বংশ ইতিহাস, মানসিক লক্ষণ ও সার্বদৈহিক লক্ষণ মিলিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়, যা অন্য কোন চিকিৎসা পদ্ধতিতে নেই। কম খরচে, সহজে, বিনা কষ্টে ও স্থায়ী ভাবে আরোগ্য দেওয়া যায় বলেই আমি হোমিওপ্যাথিকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছি।

 

ডাক্তার রওশন আরো জানান, সঠিক চিকিৎসায় এর কোন সাইড এফেক্ট নেই তবে এর প্রয়োগ পদ্ধতিতে যদি ভুল হয় বা ওষুধ নির্বাচনে ভুল হলে ক্ষতির সম্ভাবনা অবশ্যই আছে।

 

ডাঃ ফখরুন নাহার রওশন আরো বলেন,

হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, চিকিৎসকের পক্ষে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। চিকিৎসকের এই বোধ না থাকলে রোগীর জীবনে সংশয় দেখা দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে প্রধানত অস্ত্রোপচারযোগ্য ক্ষেত্র, চূড়ান্ত এপেন্ডিসাইটিস, ফ্রাকচার, ডিসলোকেশন, গর্ভবতী নারীর চূড়ান্ত রক্তাল্পতা, অন্তিম আয়রন ও ভিটামিনের অভাব, জরায়ুর চূড়ান্ত স্থানচ্যুতি, অন্তিম সিরোসিস অব লিভার ইত্যাদি ক্ষেত্রে হোমিওপ্যাথিতে আরোগ্য সম্ভব নয়, (কিছু ক্ষেত্রে সাময়িক উপশম দেওয়া সম্ভব)। হোমিওপ্যাথিক ঔষধের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা পদ্ধতির অধীন রোগকে আটকে রাখাও উচিত নয়। এক্ষেত্রে তাৎক্ষনিক উপশম প্রয়োজন যা এলোপ্যাথিক ঔষধে সম্ভব।

ডাক্তার রওশন বলেন, এখনো অনেক মানুষ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার সফলতা সম্পর্কে জানেনা, তাদের সঠিক চিকিৎসা দিতে চাই। গ্রাম থেকে শহরে, প্রত্যেকটা ঘরে ঘরে হোমিওপ্যাথির আলো পৌঁছে দিতে চাই।

Link copied!