ঢাকা শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২৬

"বিদ্যুতের শিকল ভাঙার মহাকাব্য এবং বিজ্ঞানের নতুন যুগ: তার বিহীন বিদ্যুৎ"

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৫ মার্চ, ২০২৫, ০৮:৫৭ রাত

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অব্যাহত উন্নতি ও অগ্রযাত্রার ধারায় আমরা আজ বিজ্ঞানের নতুন যুগের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে,যখন বিজ্ঞানের উদ্ভাবনী শক্তি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে পুরো বিশ্বে।এ যুগ বিদ্যুতের ক্ষেত্রে নিয়ে আসবে আমূল পরিবর্তন, যা বিদ্যুতের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করবে এবং আমাদের জীবনকে আরো সহজ এবং গতিশীল করবে।

বিদ্যুতের শিকল ছেঁড়ার এই বৈপ্লবিক আবিষ্কারের নাম Wireless Electricity বা তারবিহীন বিদ্যুৎ।এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বৈদ্যুতিক শক্তি বাতাসের মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে প্রবাহিত হতে পারবে।যার জন্য কোন তারের প্রয়োজন হবে না। তারবিহীন বিদ্যুৎ এর বাস্তবায়নে প্লাগ, সুইচ, তার আর ট্রান্সমিশন লাইনের পুরনো গৎবাঁধা ধারণা প্রতিস্থাপিত হবে চৌম্বকীয় কম্পাঙ্ক, রেজোন্যান্স, এবং মাইক্রোওয়েভ-ভিত্তিক শক্তির প্রবাহে।এটি নিছক প্রযুক্তিগত সুবিধা নয়; বরং এটি শক্তির স্বাধীনতার ঘোষণা, এক বৈপ্লবিক পদচিহ্ন এবং বিদ্যুৎ প্রবাহের এক অভাবনীয় ধারনা, যা বিদ্যুৎ ব্যবস্থার প্রথাগত সীমাবদ্ধতাকে অস্বীকার করে, যত্রতত্র বিদ্যুৎ শক্তি ব্যবহারের সুবিধা প্রদান করবে।

আজকের বিশ্ব দাঁড়িয়ে আছে এক বৈদ্যুতিক বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে ,যেখানে বিদ্যুৎ আর তারের জালে বন্দি নয়, বরং বাতাসের বুকে ভাসমান।বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি শুধুমাত্র প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা নয়, বরং এটি হয়ে উঠতে পারে বৈদ্যুতিক বিপ্লবের এক নতুন দিগন্ত এবং শক্তি নিরাপত্তার পুনর্গঠিত রূপ। পাশাপাশি যে সকল প্রত্যন্ত অঞ্চল এখনো অন্ধকারে ডুবে আছে, সেখানে তারবিহীন বিদ্যুৎ হয়ে উঠতে পারে এক মুক্তির বার্তা এবং একটি টেকসই বিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয়। এটি কেবল প্রযুক্তির উচ্চমার্গিয় সম্ভাবনা নয়; বরং এটি জাতীয় শক্তির শক্তিশালী ভবিষ্যৎ রূপরেখা এবং উন্নয়নের সম্ভাবনার এক নতুন মানচিত্র।

তারবিহীন বিদ্যুৎ আসলে মূলত চৌম্বকীয় অনুরণন কিংবা মাইক্রোওয়েভ ট্রান্সমিশন প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। নিকোলা টেসলা এক শতাব্দীরও বেশি আগে তার বিখ্যাত টেসলা কয়েল আবিষ্কারের মাধ্যমে এই স্বপ্নের বীজ বপন করেছিলেন। আজকের আধুনিক প্রযুক্তি সেই ধারণাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে যেখানে বিদ্যুৎ বাতাসের মাধ্যমে নির্দিষ্ট তরঙ্গে রূপান্তরিত হয়ে স্থানান্তরিত হয় এবং গ্রাহক ডিভাইস সেই তরঙ্গকে পুনরায় বৈদ্যুতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে।বর্তমান বিশ্বে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি (RF), ম্যাগনেটিক রেজোনেন্স, ইনডাকটিভ কাপলিং, এবং লেজার ট্রান্সমিশনের মতো প্রযুক্তি বিদ্যুতের তারহীন প্রবাহ নিশ্চিত করছে এবং বিশ্বের প্রযুক্তিবিশারদ দেশগুলো যেমন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ইতোমধ্যে এই প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক ব্যবহার শুরু করেছে।বাংলাদেশের বিদ্যুৎ অবকাঠামো এখনও পুরোপুরি তারনির্ভর এবং জটিল সঞ্চালন ব্যবস্থার শৃঙ্খলে আবদ্ধ। যদিও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বাংলাদেশ স্বনির্ভরতার পথে হাঁটছে এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৮,০০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে কিন্তু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং গ্রিড সিস্টেমের দুর্বলতা এখনও প্রকট ।এমন বাস্তবতায় তারবিহীন বিদ্যুৎ যেন একটি বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নয়, বরং এটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গ্রিড-নির্ভরতাকে কমিয়ে এনে বিদ্যুৎ বিতরণের এক নতুন যুগের সূচনা ঘটাতে পারে। পাশাপাশি শিল্প এবং উৎপাদন খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সহায়তা করবে।কেননা শিল্প কারখানার জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ আরও নিরবচ্ছিন্ন হবে। বিশেষ করে স্মার্ট ফ্যাক্টরি বা ইন্ডাস্ট্রি ৪.০ বাস্তবায়নে এটি কার্যকর হবে। তারবিহীন চার্জিং সিস্টেম উৎপাদনশীলতায় গতি আনবে। এতে দেশের অর্থনীতি ও শক্তিশালী হবে। পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রাম, চরাঞ্চল, এবং হাওর এলাকার মতো দুর্গম জায়গায় নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পৌঁছানো এখনো বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এক্ষেত্রে তারবিহীন বিদ্যুৎ প্রযুক্তি বিদ্যুৎ পৌঁছানোর সীমানা ভেঙে ফেলতে পারে। গ্রিড সম্প্রসারণের চেয়ে এটি অধিক কার্যকর এবং ব্যয়সাশ্রয়ী হবে।

তারবিহীন বিদ্যুৎ স্মার্ট সিটির বাস্তবায়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কেননা স্মার্ট ট্রাফিক লাইট, ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT)-চালিত সেন্সর, এবং স্মার্ট হোম প্রযুক্তিতে তারবিহীন বিদ্যুৎ শহরকে আরো সুন্দর এবং সহজ করবে।পরিবহন খাতে ও অভাবনীয় বিপ্লব সাধিত হবে।বৈদ্যুতিক যানবাহন (EV)-এর ক্ষেত্রে তারবিহীন চার্জিং স্টেশন স্থাপন করা হলে, ব্যাটারি চার্জের জন্য আর প্লাগ লাগবে না। গাড়ি পার্ক করার সময়ই এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে চার্জ হবে। সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার হলো দুর্যোগের সময়ও নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। কারণ ঘূর্ণিঝড় বা বন্যার সময় বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে পরা বাংলাদেশে এক চিরন্তন সমস্যা। তারবিহীন বিদ্যুৎ ব্যবস্থা দুর্যোগের সময়েও নিরবচ্ছিন্ন শক্তি সরবরাহ করতে পারবে। মোবাইল পাওয়ার স্টেশন বা ড্রোনের মাধ্যমে জরুরি শক্তি পৌঁছানো সম্ভব হবে।তবে এই বিপ্লবের অপার সম্ভাবনার আড়ালে রয়েছে ক্রমবর্ধমান সংকট এবং চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের জন্য সেই চ্যালেঞ্জের পরিমাণটা আরো একটু বেশি।প্রযুক্তিগত পরিকাঠামোর অভাব,বৈদ্যুতিক সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি,নিয়ন্ত্রণহীন বৈদ্যুতিক চৌম্বকক্ষেত্র, তারবিহীন বিদ্যুৎ সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য উন্নত মানবসম্পদের সংকট এবং সর্বোপরি একটি যথাযথ আইনি কাঠামোর অভাব তার বিহীন বিদ্যুতের এই বিপ্লবের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।বাংলাদেশকে  যদি তারবিহীন বিদ্যুতের যুগে প্রবেশ করতে হয়, তবে কিছু পদক্ষেপ অবশ্যই নেওয়া প্রয়োজন।

গবেষণাভিত্তিক উন্নয়নের ব্যবস্থা করতে হবে।জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে যৌথ উদ্যোগে তারবিহীন বিদ্যুৎ গবেষণাকে প্রাধান্য দিতে হবে। প্রযুক্তি অবকাঠামোর উন্নয়ন প্রয়োজন।পাশাপাশি প্রযুক্তি ও গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।মানবসম্পদ উন্নয়নে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সুষ্ঠু আইনগত কাঠামো অর্থাৎ তারবিহীন বিদ্যুৎ সংক্রান্ত নীতিমালা তৈরি এবং সাইবার নিরাপত্তার বিষয়ে কঠোর আইনের প্রণয়নের ব্যবস্থা করতে হবে ।বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।বাংলাদেশের বর্তমান শক্তি সংকট এবং বিদ্যুতের প্রতি নির্ভরতা এক ইতিহাস হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু তারবিহীন বিদ্যুৎই এই পরিস্থিতির চূড়ান্ত প্রতিকার হতে পারে।বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য, যেখানে প্রতিবন্ধকতা একের পর এক হাজির হয়,সেখানে শক্তির অবাধ প্রবাহ বাংলাদেশের প্রতি কোণায় কোণায় তারবিহীন বিদ্যুৎ শক্তির সুষম বণ্টন নিশ্চিত করবে, শিকলমুক্ত স্বপ্নের এক বাস্তব রূপ হয়ে দাঁড়াবে।বাংলাদেশের জন্য, তারবিহীন বিদ্যুৎ একটি নতুন সম্ভাবনার জন্ম দিচ্ছে একটি যুগান্তকারী প্রযুক্তি যা পুরো জাতির উন্নতি, শক্তি নিরাপত্তা এবং টেকসই ভবিষ্যতের দিকে এক বিশাল পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে যা ভবিষ্যৎ উন্নত বাংলাদেশের পথের দিশা দেখাবে।

প্রজ্ঞা দাস 
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ 
ইডেন মহিলা কলেজ

Link copied!